সবুজের মায়ায় শ্রীমঙ্গল : একটি অবিস্মরণীয় আনন্দভ্রমণ শাহরিয়ার হোসেন প্রীতম বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের প্রথম দিককার দিনগুলো সব সময়ই একটু অন্যরকম হয়। আর সেই দিনগুলোতে যদি বিভাগের সবার সাথে একটি চমৎকার ভ্রমণের সুযোগ মিলে যায়, তবে তো কথাই নেই। সরকারি এডওয়ার্ড কলেজের রসায়ন বিভাগে অনার্সে ভর্তি হওয়ার পর বিভাগীয় উদ্যোগে এটিই ছিল আমার প্রথম শিক্ষা সফর। গন্তব্য—বাংলাদেশের চায়ের রাজধানী হিসেবে পরিচিত মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গল। সবুজে ঘেরা চা বাগান, লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের গভীর নীরবতা, মাধবপুর লেকের সৌন্দর্য আর বিখ্যাত সাত রঙের চায়ের স্বাদ নেওয়ার জন্য মনটা আগেই ভীষণ রোমাঞ্চিত ছিল। এই ভ্রমণটি সফল করার পেছনে আমাদের সিনিয়র ভাইদের অবদান ছিল অসামান্য। আর পুরো ভ্রমণে আমাদের সফরসঙ্গী ও সার্বিক তত্ত্বাবধানে ছিলেন আমাদের প্রিয় বিভাগীয় প্রধান ড. প্রদীপ কুমার দত্ত স্যার। স্যারের উপস্থিতি আমাদের ভ্রমণকে আরও শৃঙ্খল ও আনন্দময় করে তুলেছিল। আমাদের যাত্রা শুরু হয় কলেজ গেট থেকে, সন্ধ্যা ঠিক ৭টায়। পাবনার ব্যস্ত রাস্তা আর শহরের কোলাহল পেছনে ফেলে আমাদের গাড়ি ধীরে ধীরে এগিয়ে চলে চায়ের দেশের উদ্দেশ্যে। বাসের ভেতরের আনন্দ, আড্ডা আর গানের তালে তালে কখন যে দীর্ঘ পথ পেরিয়ে গেলাম, তা টেরই পেলাম না। যাত্রাপথে আমাদের প্রথম বিরতি ছিল সিরাজগঞ্জের ন্যাশনাল ফুড ভিলেজে এবং দ্বিতীয় বিরতি ছিল নরসিংদীর একটি জনপ্রিয় রেস্টুরেন্টে। ভোর সাড়ে চারটার দিকে আমরা আমাদের কাঙ্ক্ষিত গন্তব্য শ্রীমঙ্গলের “টি হ্যাভেন ইকো রিসোর্ট”-এ পৌঁছাই। দীর্ঘ যাত্রার ক্লান্তি মুহূর্তেই দূর হয়ে যায় রিসোর্ট থেকে ভোরের সূর্যোদয় দেখার পর। রাতের গভীর নীরবতা ভেঙে ধীরে ধীরে আকাশে আলো ছড়িয়ে পড়ে। আকাশের ধূসর রং ধীরে ধীরে সোনালি আভায় রূপ নেয়। শিশিরভেজা ঘাসে সূর্যের প্রথম আলো পড়তেই মনে হচ্ছিল প্রকৃতি যেন এক অপূর্ব রূপকথার গল্প শোনাচ্ছে। এই দৃশ্যটি আমার স্মৃতিতে চিরকাল অম্লান হয়ে থাকবে। রিসোর্টে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে এবং ফ্রেশ হয়ে আমরা শহরের উদ্দেশ্যে বের হয়ে পড়ি। সকালের নাস্তা শেষে শ্রীমঙ্গল ঘুরে দেখার জন্য আমরা ভাড়া করি পাহাড়ি রাস্তার জনপ্রিয় বাহন “চাঁদের গাড়ি”। খোলা চাঁদের গাড়িতে করে রাস্তার দু’পাশে বিস্তীর্ণ চা বাগানের মাঝ দিয়ে চলার অভিজ্ঞতা ছিল একেবারেই অনন্য। খোলা হাওয়ায় কেউ গান গাইছিল, কেউ ছবি তুলছিল, আবার কেউ শুধু প্রকৃতির সৌন্দর্যে মগ্ন হয়ে যাচ্ছিল। আমাদের প্রথম গন্তব্য ছিল নূরজাহান টি এস্টেট। পাহাড়ি ঢালে সারি সারি চা গাছ দেখে মনে হচ্ছিল যেন পুরো পাহাড়জুড়ে সবুজ কার্পেট বিছানো হয়েছে। প্রকৃতির এই অপূর্ব সৌন্দর্য মনকে প্রশান্ত করলেও চা শ্রমিকদের কঠোর পরিশ্রমের বাস্তবতা আমাদের ভাবিয়ে তুলেছিল। প্রতিদিন প্রখর রোদ আর বৃষ্টির মধ্যে দীর্ঘ সময় কাজ করেও তারা ন্যায্য মজুরি থেকে বঞ্চিত হয়—এই বিষয়টি আমাদের মনকে কিছুটা বিষণ্ন করে তুলেছিল। চা বাগান দর্শনের পর আমরা যাই মাধবপুর লেকে। এটি ছিল ভ্রমণের সবচেয়ে প্রিয় স্থানগুলোর একটি। একদিকে পাহাড়, অন্যদিকে বিশাল লেক—প্রকৃতির এক অপরূপ সমন্বয়। লেকের জলে ফুটে থাকা শাপলা ফুল যেন পুরো পরিবেশকে স্বপ্নময় করে তুলেছিল। এরপর আমরা যাই লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানে। ঘন জঙ্গলের ভিতর দিয়ে হাঁটার সময় এক অন্যরকম অনুভূতি হচ্ছিল। সূর্যের আলো গাছের ফাঁক দিয়ে মাটিতে পৌঁছাতে কষ্ট পাচ্ছিল, ফলে জায়গাটিতে এক রহস্যময় পরিবেশ তৈরি হয়েছিল। সেখানে আমরা বিখ্যাত রেললাইনও দেখি, যেখানে অনেক চলচ্চিত্রের দৃশ্য ধারণ করা হয়েছে। সবশেষে আমরা যাই সাত রঙের চায়ের জন্য বিখ্যাত “নীলকণ্ঠ টি কেবিন”-এ। সাত স্তরের ভিন্ন ভিন্ন রঙের চা দেখে আমরা মুগ্ধ হয়ে যাই। প্রতিটি স্তরের স্বাদ ছিল আলাদা—এ যেন এক অনন্য অভিজ্ঞতা। সারাদিন ঘোরাঘুরির পর রাতে আমরা আবার রিসোর্টে ফিরে আসি। পরদিন রাতের শেষে আমরা পাবনার উদ্দেশ্যে রওনা দিই। বাসে ফেরার সময় চোখ বন্ধ করতেই ভেসে উঠছিল সেই সবুজ চা বাগান, লেকের সৌন্দর্য আর চাঁদের গাড়ির স্মৃতি। এই ভ্রমণটি ছিল বন্ধুদের সাথে কাটানো অসংখ্য সুন্দর মুহূর্তের এক অপূর্ব স্মারক। শ্রীমঙ্গলের এই সবুজ প্রকৃতি আমার স্মৃতিতে চিরদিন বেঁচে থাকবে।