কাঠের বাক্সো এস. এম. ফরিদ , সহযোগী অধ্যাপক, রসায়ন,সরকারি এডওয়ার্ড কলেজ বৃষ্টির পর আজ আকাশটা বেশ পরিষ্কার মনে হচ্ছে। তারায় তারায় ভরে গেছে। বিয়ের বাড়ির মিটমিটে বাতির মতো ঝলমল করছে। তনুর যখন বিয়ে হয় তখন এ রকম ঝলমলে বাতির সাজ দেখেছিলাম। দোতলা বাড়ি, বাড়ির পাশে বাগানের গাছ সব কিছুতেই যেন নানা বাতির ঝলমলে আলো। আমাদের বাড়িটা একটু দূরে ছিল। জানালা দিয়ে তাকালেই দেখা যেত সবটা। আমি সারারাত তাকিয়ে ছিলাম সেদিন। স্নিগ্ধ চোখে অদ্ভুত ভালো লাগার ভোর, এখনও মনে গেঁথে আছে। শুনেছিলাম ওর জামাইটা অফিসের বড় কর্তা। ঢাকায় বাড়ি-গাড়ি সব আছে। ভালোই আছে। দূর থেকে স্টেশনটা দেখা যাচ্ছে। আলো জ্বলছে স্টেশন মাস্টারের ঘরের সামনে। আজ বোধহয় বিদ্যুৎ নেই। অনেকগুলোই তো বাতি জ্বলত। আজ একটা দেখা যাচ্ছে, তাও আবার অল্প আলো। স্টেশনটা পার হলেই হাঁটতে হবে। তারপর নীলিমাদের বাড়ি। এই ছয় বছরে কত দিন-রাত এ পথে হেঁটেছি যে, পথটা প্রায় মুখস্থ হয়ে গেছে। বিয়ের দিন দুপুরে ভ্যানে করে গিয়েছিলাম যখন, তখন তো রাস্তা শুকনা, খুব তাড়াতাড়ি পৌঁছে গিয়েছিলাম। বিকেল পর্যন্ত ভালোই ছিল। সন্ধ্যার পর থেকে শুরু হলো বৃষ্টি। বৃষ্টি যেন আর থামতেই চায় না। এ বাড়ি ও বাড়ি মিলিয়ে এত মানুষ, অথচ কেউ ঘরের বাইরে যেতে পারছে না। এর মধ্যেই বিয়েটা হয়ে গেল। টিনের চালায় বৃষ্টির শব্দ ছাড়া বসার ঘরে নীলিমার সাথে প্রথম কী কী কথা হলো, কিছুই ভালো মতো শুনতে পাইনি। পরের দিন রাস্তা দিয়ে আর কিছুই চলে না। হাঁটা ছাড়া কোনো উপায়ই নেই। কাদা আর পিচ্ছিল রাস্তা। এত রাতে সাইকেলটাও নতুন বাজারে রেখে আসতে হলো। নতুন বাজার থেকে গুহাখাড়া স্টেশনটা বেশ কয়েক কিলো দূরে। তারপর আবার প্রায় মধ্যরাত। আসতেই হবে। নীলিমার বায়না। না শুনলে হয়তো আজ রাতটা আর ঘুমাবে না। কেঁদেই কাটাবে। সাত মাসের পোয়াতি বউ। এখন রাত জাগা ভালো না। রাত দশটার সময় খবর এলো, সে নাকি স্বপ্নে দেখেছে তার ছেলে হবে। আর সেই ছেলে পিস্তল দিয়ে উঠোনে খেলছে। ঘুম ভেঙে উঠেই তার বায়না—বাবুকে বলো এখনই পিস্তল কিনে আনতে। এই মেয়েটাকে আমি চিনি। আজ রাতে পিস্তল নিয়ে যেতেই হবে, না হলে বাড়ি মাথায় তুলবে। ইস! হাঁটু পর্যন্ত কাদায় মাখামাখি। প্যান্টটা অনেকটাই কাদা মেখে গেছে। বটগাছটার নিচে একটু বসে পানিতে পা ধুয়ে নেওয়া দরকার। এরপর রাস্তা পাকা, জুতা পরে এগোনো যাবে। গাছের গোড়াটা এবার চেয়ারম্যান সাহেব পাকা করে দিয়েছেন। একটা কোণায় তার নাম আর ফলক উদ্বোধনের তারিখও লেখা আছে। গাছটা অনেক পুরোনো। আমার দাদুও নাকি এ গাছের বয়স জানতেন না। কোনো এক ইংরেজ নাকি স্টেশনের পাশে তখন গাছটি রোপণ করেছিল। স্টেশন পাকিস্তান আমলে একটু সরেও গেলেও এই বটগাছটা ঠিকই আছে। কত কালের সাক্ষী এই গাছ। জুতা রেখে গাছের পাকা জায়গাটাতে বসতেই মনে হলো কে যেন ওপাশটায় বসে আছে। তারাভরা রাতের আধো-জোৎস্নায় ঠিক মানুষের অবয়ব। উঁচু গলায় জিজ্ঞাসা করলাম— — কে ওখানে? এত রাতে কোথায় যাবেন? — আমি। বাড়িতে যাবো। — আমি কে? কোন বাড়ি? একা একা মেয়ে মানুষ, এই বটতলায় কী করো? কে তুমি, এদিকে ঘুরে দাঁড়াও দেখি। মেয়েটি ঘুরে বসতেই আমার হাতের জুতা, বাবুর পিস্তল সব মাটিতে পড়ে গেল। আমি এ কী দেখছি? সেই চোখ, সেই মুখ, আর সেই তো মায়ামাখা হাসি! একদিন নোনাজলের স্নিগ্ধ চোখে বিয়ের সাজে যাকে দেখেছিলাম, হয়তো শেষ দেখাই মনে করেছিলাম। আজ আবার সেই একই সাজ, একই রূপ। চাঁদের অল্প আলোতে সেই অবিকল মুখটা আবারও! — তনু না? তুমি এত রাতে এখানে একা? — একা কেন মালয়দা! তুমি তো আছো। — আরে, তা না। এত রাতে বাড়ি যাও। তোমার জামাই কোথায়? এত রাতে একা কেউ রেখে যায় নাকি! — স্টেশনে একটু আগেই এলাম। বাবা আর কাকা ভ্যান আনতে গেছে। আমি ভাবলাম একটু ভেজা মাটিতে খালি পায়ে হাঁটি। ভালোই তো লাগছিল। তোমাকে দেখে বসলাম। — আমাকে চিনতে পেরেছো? আগে ডাকলে না কেন? — কেন চিনবো না? তোমার মতো তো আমি ভুলে যাইনি। — তনু না? তুমি এত রাতে এখানে একা? — একা কেন মালয়দা! তুমি তো আছো। — আরে, তা না। এত রাতে বাড়ি যাও। তোমার জামাই কোথায়? এত রাতে একা কেউ রেখে যায় নাকি! — স্টেশনে একটু আগেই এলাম। বাবা আর কাকা ভ্যান আনতে গেছে। আমি ভাবলাম একটু ভেজা মাটিতে খালি পায়ে হাঁটি। ভালোই তো লাগছিল। তোমাকে দেখে বসলাম। — আমাকে চিনতে পেরেছো? আগে ডাকলে না কেন? — কেন চিনবো না? তোমার মতো তো আমি ভুলে যাইনি। — বয়স চল্লিশ হলো। এই বয়সে কি আর কুড়ি-পঁচিশের কথা মনে করলে চলে? তাছাড়া এখন ঘর আছে, সংসার আছে। একটা মেয়েও তো আছে। — মেয়ের বয়স কত? নাম কী রেখেছো? — রিয়া। এই সামনে জুনে চার বছর হবে। — এত রাতে তুমি কোথায় যাচ্ছিলে? — এই স্টেশনের ওপার, শ্বশুরবাড়ি, ওখানেই যাচ্ছি। — তা এত রাতে কেন? দিনে বৌয়ের কথা মনে হয়নি? — কী যে বলো! মনে হবে না কেন? প্রাইমারি স্কুলের চাকরি। ছুটি হতে হতে সন্ধ্যা। স্কুল থেকে বাড়ি গিয়েছিলাম। রাত নয়টার সময় তোমার বৌদি পিস্তল কিনতে কয়। আচ্ছা তুমি-ই বলো। গেদা রয়েছে পেটের মধ্যে। এখন পিস্তল দিয়ে খেলবে কী? রাতের বেলায় স্বপ্নে কী দেখলো না দেখলো, ছেলেটা পিস্তল দিয়ে উঠোনে খেলবে। পাগলি বউ। কিছু বলতে পারি না। — মালয়দা, বৌদির জন্য খুব মন পড়ে, তাই না? — না, ঠিক তা না। হয়। অল্প বয়স, কী না কী পাগলামি করে বসে। — শোনো, পিস্তল-টিস্তল কিছু না। আসলে এই সময় সে তোমাকে কাছে চায়। মেয়েরা অনেক কিছুই উল্টোপাল্টা করে কয়। কোনো পুরুষ বোঝে, কোনো পুরুষ বোঝে না। — তুমি-ও কি তাই? সবই উল্টোপাল্টা বলো? — আমার বিয়ের দিন সবাইরে দেখলাম, তোমারে দেখলাম না। কোথায় ছিলে? শীতের মোটা করে চোখে কাজল দিয়েছিলাম। সবাই তো পছন্দ করে কত খেয়াল করলো। — বাড়িতে ছিলাম। কাকা বাবুতো আর নিমন্ত্রণ করলো না, তোমার বাড়ির কাজের লোক দিয়ে জানালো। বাবার মনটা ভেঙে গেল। যত গরিবই হোক আপন দাদা তো। একবার কাকা বাবু আসলেই পারতো। রাস্তার এপার ওপারই তো, কতই বা দূর ছিল। বাবা কয়, “দেখ মালয়, টিনের চালের বাড়ির সাথে দোতলা বাড়ি কত দূরের পথ।” — তুমি-তো আসতে পারতে? বৌভাতের মেলাতে একটা কাজলদানি আনতে দিয়েছিলাম কী জন্য? — তখন তো আর দালান ছিল না! — দালান আমার বাপের, আমার তো না। দেখতে দেখতে সবকিছু কত বদলে গেল। আমাদের বাড়ি যত পাকা হতে থাকলো, বাবা আর কাকার সম্পর্কটা তত কাঁচা হতে থাকলো। — বাদ দাও তনু। আজ এত সাজি আসলে যে? বাপের বাড়ি আসলে মানুষ এত সাজে নাকি? — সাজছি তোমারে দেখাতে। ভালো করে দেখো। চোখে মোটা কাজল দিয়েছি, নাকে নথ, গায়ে বেলি ফুলের সেন্ট মেখেছি। আচ্ছা মালয়দা, বেলি ফুল কি এখনও পছন্দ করো? সত্যিই তো! এতক্ষণ খেয়াল করিনি। চারপাশটা বেলি ফুলের গন্ধে মৌ মৌ করছে। ছোটবেলায় স্কুলে যাওয়ার পথে মন্দিরের পাশ থেকে বেলি ফুল চুরি করে তনুর জন্য নিয়ে আসতাম। ও বলতো, এই ফুলের গন্ধে নাকি ওর এলার্জি হয়। তাই না ছুঁয়ে বইয়ের মধ্যে রেখে দিতো। তনু আজ খুব সুন্দর করে সেজেছে। সবই আমার পছন্দের। ও কি এতদিনও মনে রেখেছে এসব পাগলামি? নাকি ওর জামাই এসব পছন্দ করে? — মালয়দা, আমারে মনে পড়ে? — এখন এসব থাক, তনু। — থাকবি কেন? বাড়িতে বেলি ফুলের গাছ লাগাইছো, মেয়ের নাম রিয়া রাখছো, পাটুলির প্রাইমারি স্কুলের মাস্টারও তো হয়েছো। — বাদ দাও। কী হবে এসব মনে করে? — মালয়দা, শোনো। বৌদির জন্য একটা কাজল কিনে নিয়ে যেও। চোখে মোটা করে কাজল পরা তুমি যে খুব পছন্দ করো, এটা বৌদিও জানে। তুমি শুধু তাকে বলো। সে তোমাকে অনেক কাছে চায়। সে চায়, তুমি তাকে সাজতে বলো, সারাদিন শুধু তার কাছে থাকো, তাকেই দেখো। আর এই জন্যই এটা-ওটা বলে তোমাকে কাছে ডাকে। একটা অনুরোধ করবো, রাখবে? — বলো। — আজ রাতে বৌদির সাথে একটু গল্প করো। প্রথম বাসরের মতো। বৃষ্টির শব্দে বেচারি সেদিন তোমার কোনো কথাই শুনতে পায়নি। — তুমি এসব জানলে কী করে? — ওই বাবা আসছে বোধ হয়। ভ্যানের শব্দ পাওয়া যাচ্ছে। আমি এখন যাই, মালয়দা। কাল বাড়িতে এসো, আর একবার দেখে যেয়ো। — আচ্ছা যাবো। আমি স্টেশনের দিকে হাঁটা ধরলাম। অনেক দিন পর বুকটা খালি খালি লাগছে। তনু ভালো আছে, সুখে আছে। বিধির লেখা হয়তো এমনই ছিল। স্টেশন মাস্টারের ঘরটা খোলা। মাস্টার সাহেব চেয়ারে বসে আছেন। আধো ঘুম মনে হয়। পাশের ঘরে যাত্রীদের ওখানে কেউ নেই। একটু দূরে একটা বড় বাক্স মনে হয় পড়ে আছে। কী আছে ওটাতে? এমন বাক্স তো আগে কেউ পাটুলির স্টেশনে আনেনি। কাছে গিয়ে দেখি কাঠের বাক্স। আশেপাশে কোনো লোক নেই। কেউ কি ফেলে গেছে? মাস্টার সাহেবকে বললে নিশ্চয় বলতে পারবেন কীসের বাক্স এটা। — সোহরাব চাচা, ও সোহরাব চাচা? — আঃ! কে? কী চাই, এত রাতে? — বলছিলাম, আমি মালয়। পাটুলির প্রাইমারি স্কুলের মাস্টার। এখানে কাঠের একটা বাক্স পড়ে আছে দেখছি। কী আছে ওতে? — আর বলো না। আখের বেয়াইয়ের মেয়ে তনুজার মরদেহ। মেয়েটা বিদেশে স্বামীর সাথে থাকতো। গত পরশু রোড এক্সিডেন্টে মারা গেছে। আজই লাশ এলো। ওর বাবা ভ্যান আনতে গেছে। কাল দেহ সৎকার করা হবে। সোহরাব চাচা বলেই যাচ্ছেন। আজ আবারও চল্লিশ পেরোনো বয়সে চোখটা নোনাজলে ভিজে যাচ্ছে। আকাশের জ্বলজ্বলে তারাগুলো কেন জানি আর চোখে পড়ছে না। বেলি ফুলের গন্ধটা ছড়িয়ে যাচ্ছে চারদিকে।