
**শিকড়** লেখক : মোঃ সুলতান মিয়া,প্রভাষক, ইংরেজি বিভাগ সরকারি এডওয়ার্ড কলেজ, পাবনা দূর থেকে শব্দ করে রফিক মোটরসাইকেলটির কালো ধোঁয়া বের করে চলে গেল। দু’পাশে বিস্তীর্ণ ধানক্ষেত আর মাঝখান দিয়ে এক অপরূপ মায়াবী সৌন্দর্য নিয়ে চলে গেছে পাকা রাস্তা। রফিক সুযোগ পেলেই তার বন্ধুর মোটরসাইকেল বের করে এই রাস্তায় বাইক চালায়। নিজের পরিবারের প্রতি তার মন নেই। অভাবের সংসারে সে বড় হচ্ছে—৩ ভাই ও ২ বোনের পরিবার। বাবা কৃষিকাজ করে কোনোমতে সংসার চালান। পরের জমিতে চাষ করতে না হলেও তার বাবার অল্প যে জমিটুকু আছে, সেটাই চাষ করে তাদের সংসার চলে। আজও যখন তার বাবা ক্ষেতে কাজ করছিলেন, তখন রফিক হর্ন বাজিয়ে জোরে শব্দ করে চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে থাকেন। অবাক, নির্বাক হয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলেন ভবিষ্যৎ ছেলের জন্য। রফিক বাইক চালিয়ে প্রান্তরের মাঝে ব্রিজের রেলিংয়ের উপর বসে, সাথে তার বন্ধু সুমনও আছে। দু’পা দোলাতে দোলাতে, বা হাতে বাইকের চাবির রিংটা ঘোরাতে ঘোরাতে, মুখ ভরে সিগারেটের সাদা ধোঁয়া ছাড়তে থাকে। সাদা-নীল ধোঁয়া কুণ্ডলী পাকিয়ে উপরে উঠে বাতাসে মিলিয়ে যায়, আর রফিক মুগ্ধভাবে তা পর্যবেক্ষণ করে। রফিকের কথাবার্তা, পোশাক-আশাকে আধুনিকতার ছাপ। সে পারফিউম মেখে ঘর থেকে বের হয়, সারাদিন বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দেয়, ঘুরে বেড়ায়—শুধু খাওয়ার সময় বাড়িতে আসে। এ নিয়ে তার ছোট বোন নীলা কিছু বললে সে জোরে ধমক দেয়। এমনকি একদিন নীলা, ভাইয়ের পারফিউমটা একটু গায়ে মেখেছিল বলে রফিক তাকে মেরে নাক দিয়ে রক্ত বের করে দিয়েছিল। বাবার কোনো কথায় সে কান দেয় না, যেন নিজেকে পরিবারের অন্যদের থেকে আলাদা ভাবে। রফিকের হাতে থাকা অ্যান্ড্রয়েড ফোনটিও সে বাবার কাছ থেকে জোর করে টাকা নিয়ে কিনেছিল। একদিন যখন তার বাবা আজগর আলী দেখলেন ছেলে বাইক নিয়ে যাচ্ছে, তখন পাশের কৃষক রহিম উদ্দিন বললেন, “পোলাডারে লাই দিয়া দিয়া মাথায় তুলছো, এখন কাজেকর্মে লাগাইয়া দিয়া বিয়া দিয়া দাও। বয়স আইয়া যাইতেছে।” আজগর আলী নির্বাক থাকেন, কিছু বলেন না। তিনি একজন কঠোর পরিশ্রমী মানুষ—শরীরে শক্তি, মনে দৃঢ়তা। তিনি চান মন থেকে তার ছেলেকে মানুষ করতে। তিনি অনেক সময় চোখের পানি ফেলেন, কিন্তু ভেঙে পড়েন না। একদিন বাজারে হঠাৎ একটি দামি গাড়ি আসে। গাড়ি থেকে এক ভদ্রলোক ও তার মেয়ে নামেন। ভদ্রলোকের নাম মি. চৌধুরী—তিনি এলাকায় জমি কিনে একটি বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়তে চান। রফিক কোনো কিছু না ভেবেই তার সাথে কথা বলতে এগিয়ে যায়। বড়লোকদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ার তার দীর্ঘদিনের ইচ্ছা। কথা বলতে বলতে মি. চৌধুরীর মনে হয়, রফিক একটি উচ্চবিত্ত পরিবারের ছেলে। রফিক কৌশলে তার গ্রাম্য ভাষা পরিহার করে আভিজাত্যপূর্ণ ভাষায় কথা বলতে থাকে। এক পর্যায়ে মি. চৌধুরী জিজ্ঞেস করেন, “তোমার বাবা কী করেন?” প্রশ্নটি শুনে রফিক কিছুটা বিচলিত হয়ে পড়ে। তার মাথা ঘুরতে থাকে, কপালে ঘাম জমে। মানুষ যখন মিথ্যা বলার চেষ্টা করে, তখন তার চোখ পিটপিট করে, কথা জড়িয়ে যায়—রফিকের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম হলো না। সে জড়িয়ে জড়িয়ে বলল, “বা-বা… কোম্পানির চাকরি করতেন, এখন পেনশনে আছেন… বাবার ডায়াবেটিস…” তারপর বিষয় ঘোরানোর জন্য বলল, “আপনি কোন জায়গা কিনতে চান? আমি আপনাকে সাহায্য করতে পারি।” সেই রাতেই রফিক বাড়ি ফিরে শুয়ে পড়ে, কিন্তু তার ঘুম আসে না। বাবার পরিচয় নিয়ে তার মনে দ্বন্দ্ব শুরু হয়। সে ভাবতে থাকে—কৃষক বাবা তার পরিচয়কে ছোট করে দেয়। সে চায় না সবার সামনে তার বাবার প্রকৃত পরিচয় প্রকাশ করতে। অন্যদিকে, আজগর আলী সারাক্ষণ ভাবেন কীভাবে ছেলেকে সঠিক পথে আনা যায়। এক সকালে তিনি ছেলেকে ডেকে নিয়ে যান মাঠে। তিনি বলেন— “দেখ বাবা, আমরা গরিব মানুষ। আমাদের কাজ মাটির সঙ্গে। এই শক্ত মাটির দলা আমি নিজের হাতে ভেঙে সমান করি, পানি দিই, ধান গাছ লাগাই। এই মাটির গন্ধ আমাদের প্রাণে লাগে। গরিবের অবস্থা বদলাতে চাইলে আগে মাটিকে ভালোবাসতে হবে। দুই হাত দিয়ে মাটি ধরতে হবে। মাটিকে ভালোবাসতে হবে। তারপর নিজের ভাগ্য বদলাতে হবে। বড়লোক হতে চাও—খারাপ নয়। কিন্তু তার আগে নিজের শিকড়কে চিনতে হবে। গাছ যেমন শিকড় থেকে জন্মায়, তেমনি মানুষও তার শিকড় থেকেই বড় হয়। শিকড় ভুলে গেলে কেউ বড় হতে পারে না। নিজের অস্তিত্বকে লুকিয়ে রেখে সমাজে সম্মান পাওয়া যায় না। কাক যদি ময়ূরের পালক পরে, তাতে সে ময়ূর হয় না—মানুষ তাকে হাসে।” বাবার কথাগুলো রফিকের কানে ঘড়ির টিকটিক শব্দের মতো বাজতে থাকে। তার মনে হয়, কেউ যেন মাথায় হাতুড়ি দিয়ে আঘাত করছে। কপালে ঘাম জমে, এক অদ্ভুত অনুভূতি তাকে আচ্ছন্ন করে। জীবনে এই প্রথম সে এমন অনুভব করে—নিজের ভেতরের সত্যের মুখোমুখি হওয়ার অনুভূতি।
রুপপুর পারমানবিক চূল্লী , প্রফেসর মোঃ লুৎফর রহমান
The Sailor of the Seven Seas , translated by Noor-E-Alam
যে চিঠি দেবো বলে অপেক্ষায়, আতিক শাহরিয়ার
**Department of Political Science**, Professor Md. Abdul Hamid