লেখক : মোঃ নাজমুল হক , সহযোগী অধ্যাপক, ইংরেজি, সরকারি এডওয়ার্ড কলেজ

[১ম পর্ব]
হেমন্তকালে সকালবেলায় হালকা শীতের আমেজে বাজারে যাওয়ার টাটকা, ফ্রেশ অনুভূতি অনেকটা বহুদিন অপেক্ষার পর প্রেয়সীর সাথে দেখা করতে যাওয়ার মতোই সজীব ও আকর্ষণীয় মনে হয়। টাটকা শাক-সবজির ঘ্রাণ, মাছের বাজারে এই মাত্র ধরে আনা নানা রকমের মাছের উথাল-পাথাল নৃত্য, নিরীহ-গ্রামীণ মানুষগুলোর কোলাহল, কর্মচাঞ্চল্য সব কিছু মিলিয়ে এ এক অকৃত্রিম আন্তরিকতার আশ্রয়।
শুক্রবারের সকালবেলার বাজার তাই আমার কাছে সাংসারিক প্রয়োজনের চেয়ে প্রিয় একটা শখের অনুষঙ্গ। আজ শুক্রবার। বরাবরের মতোই বাজারের পাশের এক চায়ের স্টলে বসে এক কাপ চায়ে তৃপ্তির চুমুক দিয়ে তারপর ধীর পায়ে এগিয়ে চলেছি বাজারের দিকে। দেশি লেবু কিনেছি। আজ দুপুরে মুরগির মাংসের ঝোল দিয়ে গরম ভাত মাখিয়ে সাথে লেবুর রসে বেশ জমে উঠবে। দুটো মাঝারি রুই মাছ কিনলাম, সাথে লাউ আর জলপাই... ঐশির মাকে বলব লাউ দিয়ে রুই মাছের ঝোল করতে, সাথে জলপাই ভর্তা দিয়ে খেতে কী যে মজা হবে! আসলে আমার বাজারে প্রতিটা জিনিস কেনার পিছনে একটা করে কল্পনা, স্বপ্ন জড়িয়ে থাকে ৷ খাবার টেবিল আমার কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে প্রিয় জায়গা, আর প্রিয় খাবার মজা করে খাওয়া আমার কাছে বিশুদ্ধতম শিল্প। যাই হোক, অনেক দরদ দিয়ে বেছে বেছে বাজার করে শেষ করলাম। এবার বাড়ি ফেরার পালা। রাস্তার পাশে এসে বড় বাজারের ব্যাগ নিয়ে রিকশার জন্য দাঁড়ালাম। এক অল্পবয়সী ছেলের রিকশা থামিয়ে ব্যাগসহ উঠে পড়লাম। ছেলেটি দেখতে গরিব কিন্তু বেশ পরিপাটি; মাথায় ক্যাপ, কমদামি একটা সবুজ শার্ট, শার্টের একটা বোতাম ছেঁড়া, পরনে সেকেন্ডহ্যান্ড মার্কেট থেকে কেনা কালো জিন্সের কোয়ার্টার প্যান্ট। মাথার চুল কিছুটা এলোমেলো, আর চাহনিতে কিছুটা মায়া, কিছুটা রহস্যের ছাপ। চোখের চাহনিতে তার অভাবের রেখা স্পষ্ট—দেখে কেমন যেন মায়া লাগল। ***
রিকশায় উঠেই ১০ টাকা ভাড়া আগেই দিয়ে দিলাম। বাজার থেকে নুরজাহান মার্কেট অল্প রাস্তা। ছেলেটি টাকা হাতে নিয়ে একটু মুচকি হেসে রিকশা চালাতে শুরু করল। আমি লক্ষ্য করলাম, রিকশা চালানোর সময় ছেলেটি খুবই অদ্ভুত ভঙ্গিতে রাস্তার বাঁক, দুপাশের জনগণের আনাগোনা, দোকানপাট—সবকিছু তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে লক্ষ্য করে এগোচ্ছে। কিছু সময় পর আমার বাসার সামনে রিকশা এসে পৌঁছাল। আমি যে বাসায় থাকি, তা থেকে রাস্তার দূরত্ব মাত্র ১০/১৫ হাতের বেশি হবে না। বড় ব্যাগ ঢোকাতে হবে ভেবে আমি রিকশা থেকে নেমে বাসার বাইরের কলাপসিবল গেটটা কিছুটা ফাঁকা করার জন্য ধীর পায়ে এগিয়ে যাচ্ছি। পিছনে রিকশাতে আমার বড় বাজারের ব্যাগটা রাখা ছিল। মাত্র কয়েক সেকেন্ড পেরিয়েছে। গেটটা ফাঁকা করেই আমি পিছনে ঘুরেছি। ঠিক যখন মাথা ঘুরিয়েছি, সেই অল্প সময়ের মধ্যেই সেই রিকশাওয়ালা ছেলেটি বাজারের ব্যাগসহ এমনভাবে রিকশা টান মেরে সামনের রাস্তার বাঁকে নিজেকে আড়াল করে ফেলেছে—তা আমার কাছে নিতান্তই যাদুর মতো মনে হল। আমি বুঝলাম, ছেলেটি এমনভাবে আমার হাঁটা, আশেপাশের লোকজনের অবস্থান, তাদের চাহনি, গতিবিধি, সামনের রাস্তার বাঁক এবং তার রিকশার গতিবেগ—সবকিছুকে কাজে লাগিয়েছে যে নিমিষেই আমার দৃষ্টিসীমা থেকে নিজেকে আড়াল করতে সক্ষম হয়েছে।
এত শখ আর স্বপ্ন দিয়ে ঘেরা আমার বাজারের ব্যাগটা হারিয়ে আমি পুরোটা দিশেহারা হয়ে পড়লাম। কী হলো, কীভাবে হলো, কখন হলো, কেন হলো—কিছুই মেলাতে পারছিলাম না। আমি সাথে সাথে আরেকটা রিকশায় উঠে তাকে অনুসরণ করতে শুরু করলাম। আমার সেই মুহূর্তে মনে হচ্ছিল, ঐ ছেলেটির মতো এত বড় চোর পৃথিবীতে আর দ্বিতীয়টি নেই। রাতের আঁধারে ঘরে ঢুকে চুরি করে যে, তাকেও একটা শ্রেণিতে ফেলা যায়, কিন্তু মানুষের বাজার করা ব্যাগসহ এভাবে দিনে দুপুরে চোখের সামনে দিয়ে উধাও হওয়া—এত বড় যচ্চুরি কিছুতেই মেনে নিতে পারছিলাম না। আমার রিকশাওয়ালাকে আরও দ্রুত হাকালাম—আরও জোরে, আরও জোরে এগোচ্ছি আমি। আজকে ঐ ব্যাটা রিকশাওয়ালা চোরকে ধরবই, আর জন্মের মতো ওর চুরি করার সাধ মিটিয়ে দেব। কিন্তু একটু পরেই লক্ষ্য করলাম, সামনে সামান্য দূরত্বে আরও একটি বাঁকে রাস্তা দুই ভাগে ভাগ হয়ে গেছে। আমার কাছে পুরো ব্যাপারটা এবার পরিষ্কার হয়ে গেল। ঐ রিকশাওয়ালা আমাকে নিয়ে আসার পথে পুরো রাস্তার বাঁকগুলোর মধ্যবর্তী দূরত্বের এবং সেই সাথে তার রিকশার সর্বোচ্চ গতিবেগের একটা হিসাব করতে করতে আসছিল। শেষ সুযোগটা আমিই তাকে দিয়েছিলাম—রিকশাতে ব্যাগ রেখে নেমে কলাপসিবল গেটটা খুলতে এসে। মনের দুঃখে কিছুক্ষণ ছোটাছুটি করে যখন ছেলেটিকে ধরতে পারলাম না, তখন অসহায়ের মতো বাড়ির দিকে রওনা দিয়ে খালি হাতে বাসায় পৌঁছালাম
[পর্ব ২]
বিশ্বাস যখন অবিশ্বাসের কাছে হেরে যায়, দুঃখ হয়। সত্য যখন মিথ্যার কাছে অবনত হয়, হৃদয় কেঁদে ওঠে। জীবন বড়ই বিচিত্র। আজ অল্পবয়সী এক রিকশাওয়ালার কাছে প্রতারিত হয়ে জীবনের প্রতি আমার যে বিশ্বাস ও আস্থার জায়গা ছিল, তার ভিত যেন কেঁপে উঠল। খেটে খাওয়া গরিব শ্রেণির এই মানুষগুলোর প্রতি আমার সুপ্ত একটা শ্রদ্ধাবোধ ছিল; সহানুভূতির একটা জায়গা আমি ভিতরে লালন করে এসেছি সব সময়।
বছর ছয়েক আগের একটা ঘটনা হঠাৎ আমার স্মৃতির পাতায় ভেসে উঠল। ২০১৫ সালের ঘটনা। তখন ছিল রোজার মাস। একদিন সন্ধ্যায় ইফতার করার পর বেশ ক্লান্ত লাগছিল। কিছুতেই বাইরে বের হতে মন চাইছিল না। বারান্দায় দাঁড়িয়ে সামনের রাস্তার উপর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখছি। রাস্তার ল্যাম্পপোস্টের হালকা আলোয় দু-একজন পথচারীর অলস পথচলা চোখে পড়ল। আমার প্রয়োজন একটা রিকশা। বারান্দার গ্রিল ধরে দাঁড়িয়ে মৃদু আলোয় লক্ষ্য করলাম, একটি রিকশাওয়ালা রাস্তা দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। ডাক দিয়ে থামালাম। রিকশাওয়ালা ছেলেটির বয়স ১৮–২০ হবে; অন্ধকারে মুখটা ঠিকমতো দেখতে পারিনি। বারান্দার কাছে ডেকে এনে তাকে বললাম—"এই নাও—এই ১০ টাকা তোমার।" সারাদিনের প্রচণ্ড পরিশ্রমে নুয়ে পড়া শরীরে হয়তো বাড়ি ফিরছিল ছেলেটি। আমার কথা শুনে সে বেশ অবাক হল। গ্রিলের ভেতর থেকে আমি এইবার একটা কাগজ বের করে তাকে ধরিয়ে দিয়ে বললাম—"এখানে দুটো নাম্বার লেখা আছে, ৫০ টাকা করে মোট ১০০ টাকা ফ্লেক্সি করতে হবে, ঠিক আছে?" এই বলে একটা চকচকে ১০০ টাকার নোট তার হাতে ধরিয়ে দিলাম। টাকাটা নিয়ে রিকশাওয়ালা ছেলেটি আমার দিকে একবার তাকানোর চেষ্টা করল; আঁধারে আমার মুখটাও হয়তো সে দেখতে পায়নি। তারপর দ্রুত রিকশা নিয়ে দূরে অন্ধকারে মিলিয়ে গেল।
আমি নিজের প্রতি মুচকি হেসে ভাবলাম—১০০ টাকার বিনিময়ে আজ একটা পরীক্ষা হয়ে যাক—পৃথিবীতে সততা বলে আজও কিছু অবশিষ্ট আছে কিনা। জীবন-জোয়ালের ভারে মানবতা মাটির সাথে মিশে যায়নি তো? নিতান্ত কষ্টে যাদের মাথার ঘাম পায়ে ফেলে জীবনসংগ্রাম এগিয়ে চলে, সততা তাদের হৃদয়ে কিছুটা ঠাঁই পায় কি? নিজের মনের মধ্যে প্রশ্ন-জালে পেঁচিয়ে ফেলছি নিজেকে বারবার। আজ ১০০ টাকার বিনিময়ে জীবনকে নিয়ে একটা এক্সপেরিমেন্ট করতে চলেছি মাত্র। অপেক্ষা করছি। কিছুক্ষণের মধ্যে বগুড়া থেকে আমার ছোটভাইয়ের ফোন বেজে উঠল—"ভাইয়া, এইমাত্র ৫০ টাকা ফ্লেক্সিলোড পেলাম। তুমি পাঠাইছো?" আমি সত্যিই তখন আনন্দে, আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়েছি। অসহায়, জীর্ণ, শীর্ণ সেই ছেলেটির আবছা মুখ আমার সামনে ভেসে উঠল। আমি আনন্দের আধিক্যে চোখের পানি মুছলাম। রাজশাহীতে আমার মায়ের কাছে ফোন দিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম। তার ফোনেও যথারীতি ফ্লেক্সিলোড পৌঁছে গেছে। সবচেয়ে অবাক হলাম, যখন মা বললেন তার ফোনে ৬০ টাকা এসেছে। আমি হিসাব মেলাতে গিয়ে হোঁচট খেলাম—আমি তো ৫০ টাকা পাঠাতে বলেছিলাম দ্বিতীয় নম্বরে! আমি আমার নিজের কাছে হেরে গেলাম, অনুতপ্ত হলাম, শিক্ষা গ্রহণ করলাম—একটা গরিব খেটে খাওয়া রিকশাওয়ালার মধ্যেও আত্মসম্মানবোধ থাকতে পারে—জীবনের কাছে এই শিক্ষা পেলাম নিবিড়ভাবে। এরকম অতীতের আঁচল ধরে যখন হারিয়ে ফেলেছি নিজেকে, তখন হঠাৎ বাইরের কলাপসিবল গেটে একজনের ডাক শুনতে পেলাম—
"স্যার, এইডা কোন কাজ করছেন? আপনার বাজারের ব্যাগ আমার রিকশার উপরে রাইখা নামাইয়া গেছেন?" আমি স্বপ্ন দেখছি না তো? আমার বাজারের ব্যাগ যে এভাবে ফেরত পাব, তা কল্পনাতেও আনতে পারছি না। আমি ব্যাগের দিকে একবারও তাকাইনি—ছেলেটির দিকে বারবার তাকিয়ে অবাক হচ্ছি। আমি যখন তাকে চোর ভেবে পিছু নিয়েছিলাম, সে তখন বুঝতেই পারেনি যে তার রিকশায় আমার ব্যাগটা রাখা ছিল।
বেশ খানিক দূরে যাওয়ার পর যখন সে টের পেয়েছে, সাথে সাথে নতুন আরেকটি ভাড়া ছেড়ে দ্রুত ছুটে এসেছে আমার বাসার দিকে। "সত্যিই স্যালুট তোমায়"—বারবার বলতে ইচ্ছে করছিল। মনে মনে বারবার ঐ রিকশাওয়ালার সততার কাছে নিজেকে অপরাধী মনে হচ্ছিল। পৃথিবীর সবচেয়ে সৎ মানুষটিকে আমি সবচেয়ে বড় চোর মনে করে পিছু নিয়েছিলাম। পকেট থেকে ৫০ টাকা বের করে যখন তাকে দিতে গেলাম, সে কিছুতেই নিতে রাজি হলো না। আমি তাকে নিজের ছোটভাই ডেকে জোর করে হাতের মধ্যে টাকাটা গুঁজে দিয়ে কিছুটা নিজের ক্ষুদ্রতা ঢাকার চেষ্টা করলাম।
লেখক : মোঃ নাজমুল হক , সহযোগী অধ্যাপক, ইংরেজি, সরকারি এডওয়ার্ড কলেজ