
"ডাক্তার" শাওন আহাম্মেদ রাত ১০:৪১ বাজে। আমি পড়ার টেবিলে বসে আছি। ঠিক এমন সময় আম্মু দুধের গ্লাস হাতে আমার রুমে প্রবেশ করল। আমার মতে দুধ হচ্ছে পৃথিবীর সব থেকে খারাপ খাবার। কারণ দুধের গন্ধ আমার একদম পছন্দ না। কিন্তু তারপরও আম্মুর সামনে ভয় পেয়ে বলা যায় না যে দুধ খাবো না। তাই বাধ্য ছেলের মতো বললাম—রেখে যাও, একটু পর খেয়ে নিব। তারপর আম্মু টেবিলে গ্লাসটি রেখে চলে গেল। আম্মু যাওয়ার পর প্রতিদিনের মতো আমার ভাগের দুধ বিড়ালকে খাওয়াতে দিলাম। আজকে কেন জানি না পড়তে ইচ্ছা করছে না, কিন্তু আব্বুর ভয়ে পড়ার টেবিল থেকে উঠতেও পারছি না। আমার আব্বুর ছোটবেলা থেকেই আমাকে নিয়ে অনেক স্বপ্ন। আমার আব্বু চায় আমি যেন অনেক বড় ডাক্তার হই। অবশ্য শুধু আব্বুর না, আমারও ইচ্ছা ডাক্তার হওয়ার—কারণ একজন ডাক্তারের ইনকাম অনেক। আমার ডাক্তার হতে চাওয়ার মূল কারণ বলা যায় এই পেশায় আয় বেশি। এইসব কথা ভাবতে ভাবতে ঘড়িতে দেখি ১২:০৬ বেজে গেছে। তো এখন ঘুমাতে গেলে আব্বুর হয়তো রাগ করার কথা না। তাই বইটা বন্ধ করে ঘুমানোর জন্য বিছানায় গেলাম। বিছানায় যাওয়ার পর দেখি বালিশের পাশে পড়ে আছে আমার ফোন। সারাটা দিন আব্বু-আম্মুর ভয়ে ফোনটা হাতে নেওয়া হয় না। ফোন হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ ফেসবুকে ঘাঁটাঘাঁটি করে সেদিনের মতো ঘুমিয়ে গেলাম। সকালে আম্মুর ডাকে ঘুম ভাঙল। এখনও ঠিকমতো ভোরের আলো ফুটেনি। আম্মুর আদেশ—এখন পড়তে বসতে হবে। একরকম মনের বিরুদ্ধে গিয়ে পড়তে বসলাম। আমি মাত্র কিছুদিন আগে এইচএসসি পরীক্ষা শেষ করেছি। পরীক্ষার পরের দিন আব্বুকে বলেছিলাম মামার বাসায় ঘুরতে যাওয়ার কথা। কিন্তু আব্বুর কড়া নির্দেশ—মেডিকেলে চান্স না পাওয়া পর্যন্ত কোথাও যাওয়া যাবে না। এরপর থেকে কোথাও যাওয়া হয়নি। যাই হোক, সকাল থেকে শুরু করে ১০টা পর্যন্ত পড়ার পর সকালের খাবার খেলাম। খাওয়া শেষে বিশ্রাম নিতে যাব এমন সময় আম্মু পাশের দোকান থেকে কিছু বাজার আনতে বলল। আমি একটা ব্যাগ নিয়ে বাজারের উদ্দেশ্যে বের হলাম। বাসা থেকে কিছু দূর যাওয়ার পর পেছন থেকে “রনি রনি” ডাকে শুনলাম। আমি একটু অবাক হলাম—মেয়ে মানুষ আমাকে কেন ডাকছে? পেছনে তাকিয়ে দেখি একটি মেয়ে আমার নাম ধরে ডাকছে। আমি বললাম, “আমাকে ডাকছেন?” মেয়েটি বলল, “হ্যাঁ, আপনাকেই ডাকছি। আপনার সাথে আমার কিছু কথা আছে।” আমি বললাম, “জি বলুন।” মেয়েটি বলল, “আমার নাম রিয়া। আমি আপনার সাথেই আপনার কলেজেই পড়ি।” আমি বললাম, “ও আচ্ছা, আমি তো আপনাকে তেমন চিনি না। তো কী বলবেন বলুন।” মেয়েটি বলল, “আমি জানি আপনি আমাকে চেনেন না, কিন্তু আমি আপনাকে অনেক আগে থেকেই চিনি। কলেজের প্রথম দিন থেকেই আপনাকে আমার ভালো লাগে। কিন্তু এই দুই বছরে কিছু বলা হয়নি। অনেক দিন ধরে সুযোগ খুঁজছিলাম, আজ সুযোগ পেয়ে বলে দিলাম। এখন আপনি রাজি কি না বলুন।” আমি পুরোপুরি অবাক হয়ে গেলাম। কী উত্তর দেব বুঝতে পারছিলাম না। শেষে বললাম, “পরে জানাবো।” সে বলল, “আপনার ফেসবুক আইডিটা দেওয়া যাবে?” আমি ভাবলাম না দিলে মেয়েটি অপমানিত হতে পারে। তাই আইডি দিয়ে দিলাম। এরপর বাজার করে বাসায় ফিরে এলাম। ফোন হাতে নিয়ে দেখি ফেসবুকে রিকোয়েস্ট এসেছে—রিয়া ইসলাম আইডি থেকে। বুঝলাম ওই মেয়েটাই। রিকোয়েস্ট অ্যাকসেপ্ট করলাম। এরপর ফোন রেখে গোসল করে নামাজ পড়ে আবার পড়ার টেবিলে বসলাম। টানা বিকাল পর্যন্ত পড়াশোনা করার পর দুপুরের খাবার খেলাম। খাওয়া-দাওয়া শেষে ভাবলাম মাঠে একটু খেলতে যাব। খেলতে যাওয়ার উদ্দেশ্যে বের হচ্ছি এমন সময় আব্বুর সাথে দেখা। আব্বুকে বললাম, “একটু খেলতে যাব মাঠে।” কিন্তু আব্বু বলল, “খেলতে যাওয়া যাবে না। রুমে গিয়ে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে আবার পড়ার টেবিলে বসো।” আমি বাধ্য ছেলের মতো রুমে চলে আসলাম। রুমে এসে ফোন হাতে নিয়ে ফেসবুকে প্রবেশ করলাম। দেখি ওই মেয়েটির অনেকগুলো মেসেজ। তারপর আমি মেসেজের রিপ্লাই দিলাম এবং তার আইডিতে একটু ঢুকলাম। সেদিন রাস্তায় ভালোভাবে তার দিকে তাকানো হয়নি। আজকে ফেসবুকে প্রোফাইল পিকচার দেখে মনে হলো—মেয়েটি অনেক সুন্দর। এত সুন্দর একটি মেয়ে আমাকে মেসেজ দিচ্ছে—ভাবতেই অবাক লাগছিল। এরপর সারা বিকাল মেয়েটির সাথে কথা বলতে বলতে কেটে গেল। বিকালে যে আমার পড়ার কথা ছিল, সম্পূর্ণ ভুলে গিয়েছিলাম। আমার জ্ঞান ফিরল মাগরিবের আজান শুনে। তখন তাড়াতাড়ি ফোন রেখে দিলাম। নামাজ পড়ে এসে আবার পড়ার টেবিলে বসলাম। কিছুক্ষণ পড়তে না পড়তেই হঠাৎ বুকে ব্যথা শুরু হলো। ছোটবেলা থেকেই মাঝে মাঝে এমন ব্যথা হয়, কিন্তু কিছুক্ষণ পর ঠিক হয়ে যায়। আজও তেমনই শুরু হয়েছে, তবে ব্যথাটা একটু বেশি মনে হচ্ছে। পড়ার টেবিল থেকে উঠে বিছানায় গিয়ে বসলাম। তখন আম্মু রুমে প্রবেশ করল। আম্মুকে বললাম বুকের ব্যথার কথা। আম্মু বলল, “গ্যাসের জন্য হতে পারে, গ্যাসের ওষুধ খাও।” কিন্তু কেন জানি মনে হচ্ছিল এটা গ্যাসের ব্যথা না। অনেকক্ষণ ব্যথা নিয়ে শুয়ে থাকার পর ব্যথাটা কিছুটা কমল। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি দশটা ত্রিশ বাজে। শরীরটা খারাপ লাগায় আজ আর পড়তে ইচ্ছা করল না। রাতে খাওয়া-দাওয়া করে ঘুমানোর জন্য বিছানায় এলাম। ফোন হাতে নেওয়ার পর ওই মেয়েটির কথা মনে পড়ল। সারাদিন তার কথাই মাথায় ঘুরছিল। মনে হলো মেয়েটিকে মেসেজ দিই। আবার মনে হলো—থাক, এখন মেসেজ না দিলেই ভালো। এমন অনেক চিন্তা-ভাবনার পর শেষমেশ মেসেজ দিলাম। সে সাথে সাথেই রিপ্লাই করল। তারপর অনেকক্ষণ তার সাথে কথা বললাম। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি রাত ১২:৩০ বাজে। তখন কথা শেষ করে ফোনটা বালিশের পাশে রেখে দিলাম। মেয়েটির প্রতি কেন জানি এক ধরনের টান অনুভব করছিলাম। দুই-একদিনের মধ্যেই এই অনুভূতি তৈরি হয়েছে। মেয়েটির কথা ভাবতে ভাবতেই কখন ঘুমিয়ে পড়েছি বুঝতেই পারিনি। ঘুম ভাঙল আম্মুর ডাকে। সকালে নাস্তা করার জন্য ডাকছে। ঘুম ভাঙার পর থেকেই আবার বুকের তীব্র ব্যথা অনুভব করছি। মনে মনে ভাবলাম—আগে মাসে এক-দুইবার ব্যথা হতো, এখন দেখি সপ্তাহে তিন-চারদিন হচ্ছে। একসময় ব্যথা এত তীব্র হয়ে উঠল যে আমি জ্ঞান হারালাম… চোখ খুলে দেখি আম্মু-আব্বু আমার পাশে বসে আছে। আব্বু বলল, “তোর বুকে এমন ব্যথা হয়, আগে কেন বলিস নাই আমাকে?” আমি বললাম, “তেমন কিছু না আব্বু, এমনিতেই ঠিক হয়ে যাবে।” আব্বু বলল, “খাওয়া-দাওয়া করে রেডি হও, তোকে ডাক্তার দেখাতে নিয়ে যাব।” আমি আব্বুর কথার উপর আর কিছু না বলে সকালে খাওয়া-দাওয়া করে রেডি হলাম। তারপর আব্বুর সাথে ডাক্তারের কাছে গেলাম। ডাক্তার নানা ধরনের টেস্ট করতে দিল। সব টেস্ট শেষ করে রিপোর্টের জন্য আমি আর আব্বু হাসপাতালে বারান্দায় একটি বেঞ্চে বসে আছি। আব্বুর মুখের দিকে তাকিয়ে দেখি তিনি খুব চিন্তায় আছেন। হয়তো মনে মনে দোয়া করছেন—আমার যেন বড় কোনো রোগ না হয়। কিন্তু আমি বুঝতে পারছিলাম—আমার হার্টে বড় ধরনের সমস্যা হয়েছে। প্রায় দুই ঘণ্টা অপেক্ষার পর রিপোর্ট হাতে এলো। আব্বু রিপোর্ট নিয়ে ডাক্তারের চেম্বারে ঢুকলেন। আমি ইচ্ছা করে তার সাথে গেলাম না—বাইরেই বসে রইলাম। কিছুক্ষণ পর আব্বু বের হলেন। তার মুখ আগের চেয়ে আরও কালো হয়ে গেছে। চোখ দুটো লাল—মনে হচ্ছিল অনেকক্ষণ ধরে কেঁদেছেন। তখনই বুঝে গেলাম—আমার ধারণাই ঠিক। আমার কাছে এসে আব্বু বললেন, “তেমন কোনো সমস্যা নাই। গ্যাসের জন্য বুকে ব্যথা হচ্ছে। কিছু ওষুধ দিয়েছে, এগুলো খেলে ঠিক হয়ে যাবে।” আমি বুঝতে পারছিলাম—আব্বু মিথ্যা বলছেন। তবুও কিছু না বুঝার ভান করে বললাম, “চলো আব্বু, বাসায় যাই।” বাসায় ফিরে খাওয়া-দাওয়া করে একটু শুয়ে পড়লাম। বাসায় আসার পর থেকেই দেখছি—আম্মুর মুখটা খুব গম্ভীর। কিন্তু আমার সামনে হাসিমুখে থাকার চেষ্টা করছে। বুঝতে পারলাম—আমার রিপোর্টের কথা আম্মুও জেনে গেছে। শরীর খারাপ লাগায় বিকেলে ঘুমিয়ে পড়লাম। ঘুম ভেঙে দেখি রাত সাড়ে আটটা। অবাক হলাম—এত রাত হয়ে গেছে, তবুও কেউ পড়তে বসার জন্য ডাকেনি! অন্যদিন সন্ধ্যার ভেতর না বসলে ঝামেলা শুরু হয়ে যায়। আজ এত রাত পর্যন্ত কিছুই বলল না কেউ। তারপর পড়ার টেবিলে গিয়ে বসলাম। বই হাতে নিয়ে ভাবছিলাম—হয়তো আমি আর সুস্থ হব না। তাহলে আমার আব্বু-আম্মুর কী হবে? আমাকে নিয়ে কত স্বপ্ন ছিল আব্বুর! হয়তো তার কোনো স্বপ্নই আমি পূরণ করতে পারব না। আব্বুর প্রধান স্বপ্ন ছিল আমাকে ডাক্তার বানানো… কিন্তু এখন মনে হচ্ছে কিছুই আর সম্ভব না। নিজেকে আজ খুব ব্যর্থ মনে হচ্ছিল। হঠাৎ খেয়াল করলাম—চোখ দিয়ে পানি পড়ছে। কারও পায়ের শব্দ পেয়ে তাড়াতাড়ি চোখ মুছে ফেললাম। দেখি আম্মু রুমে ঢুকল, হাতে দুধের গ্লাস। অন্যদিন দুধ দেখলে বিরক্ত হতাম। আজ কেন জানি বিরক্ত লাগল না। বরং শান্তভাবে পুরো দুধটা খেয়ে ফেললাম। আম্মু বলল, “আজ পড়তে হবে না। আমার কাছে এসে একটু বস।” আমি আম্মুর কাছে গিয়ে কোলে মাথা রাখলাম। অনেকক্ষণ আমরা দুজন গল্প করলাম। আজ কেন জানি মনটা খুব ভালো লাগছিল। পড়াশোনার চাপে কতদিন এমন করে আম্মুর সাথে কথা বলা হয়নি! মনে হচ্ছিল—এটাই হয়তো শেষবার… এই ভাবনা আসতেই চোখে পানি চলে এলো। কিন্তু আম্মু যেন না দেখে—তাই কষ্ট করে নিজেকে সামলে নিলাম। দিন যেতে লাগল, শরীর আরও খারাপ হতে থাকল। এখন আর ঠিকমতো পড়তে পারি না, বাইরে যেতেও পারি না। জানালা দিয়ে মাঠ দেখা যায়—সেখানে অনেক ছেলে খেলছে। তাদের দেখে আমারও খেলতে ইচ্ছা করে… কিন্তু শরীর আর সায় দেয় না। মাঝে মাঝেই বুকে তীব্র ব্যথা ওঠে। এখন কয়েকদিন ধরে ফোনও ব্যবহার করি না। একদিন ফোন হাতে নিয়ে দেখি—অনেক মেসেজ, সেই মেয়েটিরও। তবুও কারও সাথে কথা বললাম না। মনে হলো—কারও সাথে কথা বললে বেঁচে থাকার প্রতি মায়া বেড়ে যাবে। তাই সব সোশ্যাল মিডিয়া ডিলিট করে দিলাম। একদিন দেখি আম্মু রুমে ঢুকেছে। তার চোখ লাল—নিশ্চয়ই কেঁদেছে। রিপোর্ট জানার পর থেকে তাকে আর হাসতে দেখিনি। আমার মাথায় হাত বুলিয়ে জিজ্ঞেস করল, “বুকে ব্যথা করছে?” আমি বললাম, “না আম্মু, আজকে একদমই ব্যথা করেনি।” মিথ্যা বললাম—কারণ সত্যি বললে সে আরও কষ্ট পাবে। এরপর আম্মু রান্নাঘরে চলে গেল। দুপুরে খেয়ে আবার শুয়ে আছি। হঠাৎ কপালে ঠান্ডা পানির ফোঁটা অনুভব করলাম। চোখ খুলে দেখি—আব্বু কাঁদছে! আমি জীবনে কখনো আব্বুকে কাঁদতে দেখিনি। কিন্তু আজ আমার সামনে ছোট শিশুর মতো কাঁদছে… মনে হচ্ছিল তাকে জড়িয়ে ধরে আমিও কাঁদি। কিন্তু পারলাম না… আব্বু বলল, “তোর কিছু হবে না। তোকে বড় ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাব।” আমি কিছু বলতে পারলাম না… এরপর দিন কেটে যাচ্ছিল… এক রাতে হঠাৎ তীব্র বুকের ব্যথায় ঘুম ভেঙে গেল। ফোনে সময় দেখলাম—ভোর ৪:১৫। শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল। বাইরে ফজরের আজান ভেসে আসছে… কিন্তু আমার ভেতরে যেন চিরকালের রাত নেমে আসছে। মনে হচ্ছিল—একটা ভারী হাত আমার বুক চেপে ধরেছে… চোখ মেলে দেখি—মায়ের মুখ ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে… শেষবারের মতো ডাকতে চাইলাম— “মা…” কিন্তু শব্দ বের হলো না। সবকিছু অন্ধকার হয়ে গেল… এক গভীর নীরবতা আমাকে গ্রাস করল। **শিক্ষার্থী, অনার্স দ্বিতীয় বর্ষ, ম্যানেজমেন্ট বিভাগ, সরকারি এডওয়ার্ড কলেজ, পাবনা**