
"জ্যোৎস্না রাতের শেষ পদচিহ্ন" দিগন্তের পর দিগন্ত জুড়ে শুধু মাঠ আর মাঠ; পুরো প্রকৃতির মাঝে একটুও শব্দ নেই। সময়টা ঠিক বসন্তকাল। চারিদিকে ফুলের সুবাস, উড়ে বেড়াচ্ছে রঙিন প্রজাপতির দল। মৌমাছি ফুলের মধু সংগ্রহে ব্যস্ত। সবুজ প্রকৃতির মাঝে তিন ভাইবোন ফুলের উপর বসা নানা রঙের ফড়িং ধরতে তৎপর। নাজমা বেগম দুই পুত্র ও এক কন্যার জননী। তিনি খুবই কঠোর শাসনে ছেলে-মেয়েদের মানুষ করেন, যাতে তারা সৎ মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠে। ফয়েজ মিয়ার অভাবের সংসার। ছোটখাটো একখানা চাকরি করে ভরপুর সংসারের ঘানি টানতে টানতে সে ক্লান্ত প্রায়। দম যেন ফুরিয়ে যায়। এত কিছুর মধ্যেও নাজমা বেগম তার সন্তানদের অভাব বুঝতে দেননি কখনোই। গ্রামের সবচেয়ে ভালো স্কুলে পড়ান বড় ছেলে হাবিবকে। ছেলেটা কথা খুব কম বলে, কিন্তু মেধাবী বেশ। সে মিথ্যা না, অন্যদিন বলা যাবে। ফয়েজ মিয়ার একটি মেয়ে আছে। বাবার আদর করে নাম রেখেছে কুসুম বানু। শান্ত প্রকৃতির সহজ সরল প্রকৃতির মতো স্নিগ্ধ তার রূপ, আর ছয় বছরের একটি ছেলে আছে, নাম বটু। ভারী দুষ্ট প্রকৃতির। তিন ভাই-বোন সারাদিন টইটই করে ঘুরে বেড়ায়—কার গাছে আম, জাম পাকলো, কোথায় কী হলো এই ধাঁধায়, ফড়িং ধরে ধরে চারকোনা রঙ চটা একটি টিনের বাক্স ভরে রাখা তাদের অন্যতম খেলার মাধ্যম। দুপুরের ভাত খেলে কীভাবে মায়ের চোখে ফাঁকি দিয়ে দরজা টপকে বাইরে পালিয়ে যেতে হয়, এই কায়দা খুব ভালোভাবেই জানা আছে তাদের। দুপুরের হাঁড় গরম করা তীব্র রোদেও তাদের কোনো ক্লান্তি নেই। হাবিব ফড়িং ধরে দেয়, বটু টিনের বাক্স যত্নে ভরে রাখে আর খিলখিল করে হাসে। কুসুম অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে তাদের কাণ্ড দেখে। তার বিবেকে বাঁধা দেয়, তার মনে হয় এটা অন্যায়। ওটুকুন মেয়ে অন্যায় বোঝে? জানিনা বোঝে কিনা, তবে তার আল্লাহর প্রতি ভয় আছে। স্মরণ হয় মায়ের দেওয়া শিক্ষা—‘কারো ক্ষতি করতে নেই; আল্লাহ পাপ দেন।’ এটুকুই তার মনে গভীর দাগ কেটে আছে। ভাই দুজন তাকে খুব একটা মূল্যায়ন করে না। সে শুধু তাদের পিছনে পিছনে ঘুরে বেড়ায়। কিছুদিন ধরেই শোনা যাচ্ছে দুটি কথা—‘মুক্তিযুদ্ধ’ ও ‘স্বাধীনতা’। সবার মুখে মুখে একই বুলি—‘মুক্তিযুদ্ধ?’ ‘স্বাধীনতা?’ সে বুঝতে পারে না এসব কথার অর্থ। তবে এটুকু বোঝে—সামনে কিছু না কিছু ঘটতে চলেছে। রেডিওতে বারবার শুধু যুদ্ধের খবর শোনা যাচ্ছে। পুরো গ্রাম যেন থমকে আছে আতঙ্কে। এখন কেউ আর তেমন বাইরে বের হয় না, খুব প্রয়োজনীয় কাজ ছাড়া। মাঝখানে নতুন বিয়ে হয়েছে, তাই বড় বোনের বাড়িতে খালুজনসহ বেড়াতে এসেছে। দুপুরের খাওয়া শেষে হাবিব ও কুসুম বায়না ধরল—রেল স্টেশনে ঘুরতে যাবে মেসো-খালু আর খালুজনের সঙ্গে। মা নাজমা তো রেগে আগুন। খানিকটা উচ্চস্বরে চেঁচিয়ে উঠে বলল, “বাচ্চা বেড়ে গেছে ছেলে-মেয়ে গুলো! একটা কথাও শোনে না। বাইরের অবস্থা যে ভালো না, তা তোদের কতোবার বলতে হবে? দেশজুড়ে যুদ্ধ লাগছে; যুদ্ধ লাগছে তোরা জানিস না? পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী এসেছে দেশে। সারাদিন রেডিওতে শোনা যায় কত মানুষ মারা যাচ্ছে।” এই বলে নাজমা বেগমের চোখ থেকে দু’ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল কপোল বেয়ে। মেঝ খালা উৎসুক ভঙ্গিতে বলল, ‘ও কিছু হবে না আপা। এদিকে সমস্যা হবে না। আমরা যাই? একটু সময়ই তো ব্যাপার।’ ‘আচ্ছা, যা তাহলে। তাড়াতাড়ি ফিরে আসিস। দেশের অবস্থা ভালো না; শুনলাম এদিকে নাকি চলে এসেছে প্রায়।’ ‘আচ্ছা, আপা তুমি চিন্তা করো না। আমরা তাড়াতাড়ি চলে আসব। শাহেনা পারভীন ও রাশেদ আহমেদ হাবিব ও কুসুমকে নিয়ে রওনা হলো স্টেশনের দিকে। স্টেশনে যাওয়ার আগে বাজার। তারপর বেদে জনগোষ্ঠীর আবাস। তারা সেখানে ছোট্ট ঘুপড়ি বানিয়ে থাকে, ছোট ছোট পাতিলে রান্না করে। কুসুম মনে মনে ভাবল, ‘মা বাইরে আসতে নিষেধ করল, বাইরে নাকি ভয়।’ কুসুম স্পষ্ট সুরে বলল উঠল, ‘আপনারা এখানে বাইরে থাকেন ভয় লাগে না? দেশে নাকি যুদ্ধ লাগছে। দেশের মিলিটারি বাহিনী আসছে। সব মানুষকে গুলি করে মেরে ফেলবে। পালান, আপনারা পালান।’ মেস খালা অবাক দৃষ্টিতে কুসুমের মুখপানে চেয়ে রইল। এক বেদে কন্যা খেলাখুলিয়ে হেসে বলল, ‘কি যে কও না আপা? গরিবের আবার ভয় আছে? আমরা বেদে আমাদের যেখানেই যায়, সেখানেই কাইত।’ একথা ওকথা বলতে বলতে উচ্চস্বরে হেসে উঠল। কুসুম মনে মনে বলল, ‘আহ, কি সুন্দর হাসি। কোনো শাসন নেই, বাঁধন নেই। এটাই কি স্বাধীনতা? আমার যদি এমন জীবন হতো? মা আসলেই পাঁকা, শুধু বকে।’ আহ! পেতাম যদি বেদের জীবন, কতই না ভালো হতো।’ হাঁটতে হাঁটতে বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা। সামনেই ওভারব্রিজ। সবাই উঠে গেলেও কুসুম ভীষণ ভয় পায়। কোনোভাবেই সে উঠবে না। হাবিব ভেংচি কেটে খেলখিলিয়ে বলল, ‘এই হা হা হা! মা! ভয় নেই, সবকিছুতেই ভয় পায় হা হা হা!’ কুসুম অভিমান করে চুপ রইল। কোনো কথাই বলল না। শাহেনা পারভীন হাবিবের মাথায় টোকা মারল, ‘এই হে! না, আর একবারও বলবি না এসব।’ সন্ধ্যার আলো আধারী কেটে রাত নামল। জ্যোৎস্না রাত। আকাশে তারার ঝলকানি, স্টেশনের ধারের হাসনাহেনা ফুল থেকে তীব্র সুগন্ধ, জ্যোৎস্না রাতের সৌন্দর্য দ্বিগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। রাশেদ সাহেব গান ধরেছেন। বাকিরা সাথে তাল মিলাচ্ছে আর হাঁটছে নদীর ধারের দিকে। কুসুম বারবার পেছনে পড়ছে। সে আর হাঁটতে পারছে না; তার পায়ে ভীষণ ব্যথা। হঠাৎ পাঁপাশ জোরে শব্দ হলো কিছু। শাহেনা বলল, এটা কিসের আওয়াজ হলো এত জোরে? হাবিব পেছনে তাকাতেই উচ্চস্বরে চিৎকার করে উঠল। হাউমাউ করে ডুকরে কেঁদে উঠল। পেছনে ফিরে সবাই দেখল কুসুমের ছোট্ট শীর্ণ দেহটি মাটিতে লুটিয়ে পড়েছে। মাটিতে রক্তের বন্যা বয়ে গেছে। বুক ঝাঝরা হয়ে গেছে গুলিতে। কুসুমের কোনো আওয়াজ নেই। তার চোখ দুটো আধবোজা হয়ে তাকিয়ে আছে আলোকিত আকাশের দিকে। চোখের কোণে বিন্দু বিন্দু জলের রেখা। কুসুমের চোখ যেন বলছে, ‘হে আকাশ-বাতাস, গ্রহ-উপগ্রহ, চাঁদ তারা সূর্য, হে সকল সৃষ্টির শ্রদ্ধা-আল্লাহ, সাক্ষী হও এই আলোকিত মুহূর্তে আমি আজ থেকে স্বাধীন।’ ‘এ কী বলে যুদ্ধ? এ কী বলে স্বাধীনতা?’ তার শরীর থেকে যেন পবিত্রতার ঘ্রাণ উচ্চতর কণ্ঠে পৃথিবীর সকলকে জানিয়ে দিল, হ্যাঁ। ‘যুদ্ধ’—সকল অন্যায় থেকে মুক্তির ‘যুদ্ধে’—সর্বশেষ প্রশান্তির হাসি ‘স্বাধীনতা’