
**এক,**
‘এদেশে শ্যামল রঙ রমণীর সুনাম শুনেছি’ কাব্যের কবি ওমর আলীর একটি অন্যতম কবিতার বই ‘রুদ্ধ নিশ্বাসে ছিলাম নয় মাস’। এই বইয়ে মোট ৭৭টি কবিতা স্থান পেয়েছে। প্রথম কবিতা ‘অপরাজিতা’ এবং শেষ কবিতা ‘২০০৪’। শেষ কবিতার আগের কবিতা ‘রুদ্ধ নিশ্বাসে ছিলাম নয় মাস’- কবিতাটির নামেই গ্রন্থের নামকরণ করা হয়েছে। এরূপ নামকরণ থেকে পাঠকের বুঝতে অসুবিধা হয় না যে, এই নয় মাস আসলে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের নয় মাসের কথাই স্মরণ করিয়ে দিয়েছে।
বাঙালির হাজার বছরের সবচেয়ে মহৎ অর্জন স্বাধীনতা। কিন্তু সেই স্বাধীনতা খুব সহজে অর্জিত হয়নি। এর জন্য বাঙালিকে চরম মূল্য দিতে হয়েছে। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ থেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত দীর্ঘ নয় মাস হানাদার পাকিস্তানি বাহিনী নিরীহ, নিরস্ত্র বাঙালির উপর যে নির্মম নির্যাতন চালিয়েছিল তারই আলেখ্য কবি ওমর আলী তাঁর ‘রুদ্ধ নিশ্বাসে ছিলাম নয় মাস’- গ্রন্থের কবিতায় তুলে ধরেছেন। কবির আপন জগতে লালিত চিরচেনা বাংলার প্রকৃতি, ফুল, ফল, পাখি, চাঁদ, জ্যোৎস্না, সুমধুর হাসি, ঠাট্টা, গান সবকিছু যেন হারিয়ে গিয়েছিল সেই অবরুদ্ধ নয় মাসে। ‘দখলদার জল্লাদ বাহিনী’ ও তাদের দেশীয় দোসর রাজাকার, আলবদর, আল শামসদের সহযোগিতায় তারা মেতে উঠেছিল বিভৎস, খুন, ধর্ষণ ও লুণ্ঠনের রক্ত পিপাসায়। কবির বর্ণনায়—
“আয়নার মতো রোদে ঝলমল করে ওঠে রক্ত পিপাসা—
পথে ঘাটে কেন এত ভয় মোড়ে মোড়ে খুনি বাহিনী
চোখ বেঁধে ধরে নিয়ে যায় লক্ষ্যহীন নিরীহ লোকদেরই
জল্লাদের হিংস্র বুলেট ঝাঁপিয়ে মগজ ভেদ করে চলে যায়
নিরপরাধ লোক রক্তাক্ত অর্ধমৃত তবু মাটিচাপা পড়ে
ইজ্জত হারায় শত সহস্র যুবতী গৃহবধূ প্রায় বৃদ্ধ নারী
নিরেট কিশোরী ইজ্জত নিয়ে সর্বদা শঙ্কিত থাকে
কখন যে কার মাথা কুঁচকে ভেঙে টুকরো টুকরো করে দেয়
দখলদার জল্লাদ খুনি বাহিনী
স্বস্তি ছিল না নয় মাস রুদ্ধ নিশ্বাসে ছিলাম”
**দুই.**
‘রুদ্ধ নিশ্বাসে ছিলাম নয় মাস’ কবিতা ছাড়াও মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আরও চারটি কবিতা আছে এ গ্রন্থে। কবিতাগুলো হলো ‘কেউ আসতে পারে’ ‘আমরা যুদ্ধ করেছিলাম’ ‘এই তো আমার দীর্ঘজীবী বাংলাদেশ’ ও ‘একটা লোক আমাকে খুঁজছে’। ‘কেউ আসতে পারে’ কবিতায় পাকিস্তানি বাহিনীর আক্রমণে শহর ছেড়ে গ্রামে পালিয়ে যাওয়ার কথা আছে। তারপর একসময় সেই গ্রামও নিরাপদ ছিল না, তখন গ্রাম ছেড়ে রাতের অন্ধকারে মাঠের মধ্যে আশ্রয় নিতে হয়েছে—
“সমুদ্রে নামলাম তারপর নদীতে নামলাম
দেশ বাঁচাতে হবে তো
শহর পেছনে ফেলে এসে গ্রামের ধুলাতে
মাখলাম ঠোঁট ও চোয়াল
যতদূর সম্ভব খড়ের ভেতরে গেলাম ঢুকে।
------------------------------------
---
এক রাত মাঠের মধ্যে ছিলাম
সে কী মশার কামড়
জীবন বাঁচাতে হবে তো।”
ত্রিশ লক্ষ মানুষের আত্মত্যাগ ও দুই লক্ষ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে অর্জিত আমাদের স্বাধীনতা। সেই স্বাধীনতা-উত্তর স্বদেশে কবির আত্মতৃপ্তি ফুটে উঠেছে ‘আমরা যুদ্ধ করেছিলাম’ কবিতায়—
“আমরা যুদ্ধ করেছিলাম পাখি ডাকা সবুজ মাতৃভূমিকে
মুক্ত করে নিশ্চিন্ত নিরাপদ সুখ শান্তিতে
বসবাসের আবাসে পরিণত করতে
আমরা আগুনের মতো ক্রুদ্ধ মুঠো ছুঁড়ে দিয়েছিলাম
হানাদারের মুখে তাদের বাধ্য করেছিলাম
আত্ম সমর্পণ করতে ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে
এই তো আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চরম বিজয়”
‘একটা লোক আমাকে খুঁজছে’ কবিতায় মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে পাকিস্তানি বাহিনীর দেশীয় দোসর এক রাজাকার মাঝে মাঝে কবিকে খোঁজ করে ৷ কবির ভাষায় -
“একটা লোক আমাকে খুঁজছে বেশ কিছুদিন ধরে
সময় নেই অসময় নেই সে আমার দরজায় হাঁকে
------------------------------------
---
লোকটার কথাবার্তায় মনে হয় সে আসলে দোসর জল্লাদের
জল্লাদরা তাকে পাঠিয়েছে আমাকে কীভাবে
ধরে নেবে কখন ধরে নিতে পারবে মাত্র সেই খোঁজ নিয়ে”
**তিন.**
কবি ওমর আলী বেড়ে উঠেছিলেন গ্রামের আলো বাতাস ও কাঁদামাটিতে। গ্রামের সাথেই ছিল তাঁর আত্মীয়তা। তিনি ছিলেন মনে প্রাণে গ্রামীণ কবি। তাই গ্রাম বাংলার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে তিনি ছিলেন মুগ্ধ। সেই মুগ্ধতা থেকেই কবি বাংলাদেশের দীর্ঘজীবন কামনা করেছেন তাঁর ‘এই তো আমার দীর্ঘজীবী বাংলাদেশ’ কবিতায়। মহান মুক্তিযুদ্ধে অনেক মানুষ তাদের স্বজনকে হারিয়েছিল। পাকিস্তানি বাহিনী সবকিছু ধ্বংস করে দিয়েছিল। তারপরও বাংলাদেশ ঘুরে দাঁড়িয়েছে। এগিয়ে যাচ্ছে সামনের দিকে। বাংলাদেশের এই অগ্রযাত্রার কথাই কবি তুলে ধরেছেন আলোচ্য কবিতায়—
“বর্গী ঠগীর হানা কতবার এই সবুজ শ্যামলের দেহে
সখিনা রহিমা মায়ারাণীদের বারবার ভেঙেছে কপাল
তবু এই মাতৃভূমি অশ্রু মুছে ধুলো ঝেড়ে কোলে নেয় স্নেহে
ঝড়ে সব ভেঙে পড়ে মরণ ফণা নামায় তরঙ্গ উত্তাল
বীর আর বীরাঙ্গনা সন্তানরা রুখে দাঁড়ায় বলে তুমি কে হে
রক্ত লাল পার হয়ে বিজয়ের উর্ষা হর্ষ হয় না আড়ালে”
শেষ জীবনে কবির মনে বিচিত্র ভাবনার সমাবেশ ঘটেছিল। তিনি চেষ্টা করেছিলেন সেইসব বিচিত্র ভাবনার শিল্পরূপ দানের। কিন্তু সেই প্রচেষ্টা সবসময় হয়তো সফলতা লাভ করতে পারেনি। মৃত্তিকা সংলগ্নতার পাশাপাশি কবি মনে প্রকৃতি চেতনা, দেশ ভাবনা, সমাজ ভাবনা ও প্রেম ভাবনার নানা সমাবেশে সজ্জিত হয়েছে এ কাব্যের অবয়ব।
**চার.**
কবিমাত্রই প্রেমিক। তাই যেকোনো কবির কবিতায় প্রেম, অন্যতম প্রধান অনুষঙ্গ হিসেবে দেখা দেয়—এটাই স্বাভাবিক। কবি ওমর আলীও এর ব্যতিক্রম নন। ‘রুদ্ধ নিশ্বাসে নয় মাস’ কাব্যের অনেক কবিতাই প্রেমের কবিতা। তবে সেই প্রেম সবসময় সরল পথে অগ্রসর হয়নি। কখনো কখনো তা বক্রপথ অবলম্বন করেছে, পরকীয়া প্রেমেও পর্যবসিত হয়েছে। আবার ব্যর্থ প্রেমের কবিতার পাশাপাশি সফল রোমান্টিক প্রেমের কবিতাও আছে। আছে স্মৃতি রোমন্থন কবিতা। এ কাব্যে কবি তাঁর শৈশব, কৈশোর ও যৌবনকালকেও কবিতার মাধ্যমে তুলে ধরার প্রয়াস দেখিয়েছেন। তাঁর ভালো লাগা মন্দ লাগার বিষয়গুলোও কাব্যিক রূপ দানের চেষ্টা করেছেন। গ্রাম ও নদীমাতৃক বাংলার প্রকৃতি তাঁর রোমান্টিক চেতনায় ধরা দিয়েছে নানা মাত্রায়। পাশাপাশি কাঁটাও বিঁধেছে সমাজে বিদ্যমান নানা অনিয়ম, অন্যায়, অত্যাচার ও অসঙ্গতি দেখে। গ্রন্থে বেশকিছু কবিতা আছে নারী কেন্দ্রিক এবং যেসব কবিতায় নারী নির্যাতনের চিত্র ফুটে উঠেছে। যৌতুকের জন্য নারীকে নির্যাতন করে হত্যা করা হয়েছে। নারীর মুখে এসিড নিক্ষেপ করা হয়েছে, নারীকে ধর্ষণ করা হয়েছে। এমনকি ধর্ষণের পর হত্যাও করা হয়েছে। এসব ঘটনায় কবি ছিলেন ক্ষুব্ধ এবং প্রতিবাদী। তাই তিনি তাঁর কবিতার অবয়বে ঘটনাগুলো জনসম্মুখে তুলে ধরে ন্যায় বিচারের প্রত্যাশা করেছেন। এ কাব্যের শেষ কবিতা ‘২০০৪’। কবিতায় কবি বলেছেন—
“বোমার ক্ষমতা ছিল তাই ধ্বংস করেছে তা উচ্চমিনার
একমাত্র ক্ষমতাবানের আজ সর্বত্র বিজয়ের নাচ
আমি এক সামান্য মূষক তাই বলবান সিংহ আমাকে
কঠোর থাবায় ধরে মুহূর্তেই নির্বিচারে মেরে ফেলতে পারে
**পাঁচ.**
কবি ওমর আলী কবি জীবনের শেষ পর্যায়ে রচিত এ কাব্যে কবির কবিতা নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষার বিষয়টিও সচেতন পাঠকের দৃষ্টিতে দৃশ্যমান। যতিচিহ্নহীন এ কাব্যের কোনো কবিতায়ই দাঁড়ি, কমা, সেমিকোলনের ব্যবহার নেই। নেই ছন্দের ধারাবাহিকতা, গদ্যের মধ্যে কখনো কখনো ছড়ার মিশ্রণ লক্ষণীয়। আবার সে ছড়াও অন্ত্যমিলহীন। এ কাব্যের কবিতাগুলোর শিল্পমান রক্ষিত না হওয়ার কারণ হয়তো কবির শেষ জীবনের দারিদ্র্য। তবে এমন না—কবিতার পাশাপাশি বেশ কিছু ভালো মানের কবিতাও রয়েছে। যেগুলো পাঠককে বিশেষ করে আমাদের মতো যারা গ্রামীণ পরিবেশে শৈশব, কৈশোর অতিবাহিত করেছি, তাদেরকে এক ঐন্দ্রজালিক স্মৃতি রোমন্থনে পুলকিত করবে—এতে কোনো সন্দেহ নেই।
লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, বাংলা, সরকারি এডওয়ার্ড কলেজ, পাবনা।