আলো দূষণ
অনন্যা তাসনিম
আলো দূষণ হল অন্ধকার অবস্থায় কৃত্রিম আলোর অধিক উপস্থিতি। কৃত্রিম আলো যখন রাতের প্রাকৃতিক অন্ধকার পরিবর্তন করে এবং পরিবেশ ও জীবজগতের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে, তখন তাকে আলো দূষণ বলা হয়।
কৃত্রিম আলো বর্তমানে আমাদের পৃথিবীর চারদিকে এক আবরণ সৃষ্টি করে ফেলেছে। দিনের চব্বিশ ঘণ্টাই আলো থাকার ফলে নষ্ট হচ্ছে নানা প্রাকৃতিক চক্র। পূর্বে, যখন পৃথিবী এত উন্নতির শিখরে পৌঁছায়নি, তখন আমরা রাতের আকাশে তারা ঝিলমিল করতে দেখতাম। রাতের আকাশের এই তারাগুলো নিশাচর প্রাণীদের পথপ্রদর্শক, সমুদ্রপথে নাবিকদের অন্যতম সহায়ক এবং সাধারণ মানুষের জন্য ছিল এক অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য—যা দেখে যুগে যুগে কবিরা লিখেছেন কবিতা, প্রেমিকরা সৃষ্টি করেছেন উপমা। কিন্তু বর্তমানে এই সৌন্দর্য ও এই সহায়তা দুটোই অপ্রতুল।
১৯৯৪ সালে, ৩১ বছর আগে, আমেরিকার লস অ্যাঞ্জেলেসে এক মধ্যরাতে একটি মারাত্মক ভূমিকম্প হওয়ার পর শহরটি বিদ্যুৎবিহীন হয়ে পড়ে। তখন সেখানকার মানুষ প্রথমবারের মতো আকাশে এক রূপালী মেঘের মতো কিছু দেখতে পায় এবং তা দেখে আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। আসলে সেটি ছিল আকাশগঙ্গা, যা তারা আগে কখনো দেখেনি। অর্থাৎ প্রথমবারের মতো তারা ঝলমলে রাতের আকাশ দেখেছিল। প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য দেখে তারা অবাক হয়ে যায়, কারণ এর আগে তারা কখনো তা দেখেনি। আর এর জন্য দায়ী ছিল এই আলো দূষণ।
২০১৬ সালে, *The World Atlas of Artificial Night Sky Brightness*–এর এক হিসাব অনুযায়ী, বিশ্বের প্রায় ৮৩% মানুষ আলো দূষিত আকাশের নিচে বসবাস করে। অর্থাৎ বিশ্বের ৮০% মানুষ প্রাকৃতিক উজ্জ্বল আকাশ দর্শন করা থেকে বঞ্চিত।
বর্তমানের কৃত্রিম আলোর আধিক্যে দিন ও রাতের পার্থক্য করা যেন একটি কঠিন কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে প্রাণীদের জন্য। নিশাচর প্রাণীরা রাতের অন্ধকারে ভালো দেখে, শিকার খুঁজে—ফলে রাত তাদের জন্য আশীর্বাদস্বরূপ। কিন্তু কৃত্রিম আলোর কারণে তারা বিভ্রান্ত হয় এবং শিকার খুঁজতে ব্যর্থ হয়। এমনকি তাদের প্রজনন, বিশ্রাম ও খাদ্য সংগ্রহের কাজেও ব্যাঘাত ঘটে। অন্যদিকে, দিবাচর প্রাণীরা আলো দেখে শিকার খুঁজতে গিয়ে কৃত্রিম আলোর প্রভাবে বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে এবং অনেক সময় আলোর দিকে আকৃষ্ট হয়ে মৃত্যুবরণ করে।
শুধু তাই নয়, একসময় রাতে জোনাকি পোকার আনাগোনা দেখা যেত। কিন্তু বর্তমানে গ্রামাঞ্চলেও এক-দুটি জোনাকি দেখা গেলেও তা প্রায় বিলুপ্ত। কৃত্রিম আলো আমাদের আধুনিকতার শিখরে নিয়ে গেলেও জীবজগতের ক্ষতি করছে ধীরে ধীরে। ঝিলমিল আকাশ ও জোনাকি পোকার মতো বিষয়গুলো ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে শুধু রূপকথা হয়ে থাকবে।
রাতে বৃদ্ধি পাওয়া উদ্ভিদগুলোর অবস্থাও করুণ। তাদের সালোকসংশ্লেষণের প্রক্রিয়ায় ব্যাঘাত ঘটছে। ফুল ফোটার সময় বিভ্রান্তি তৈরি হচ্ছে। পরাগবাহী পতঙ্গ বিভ্রান্ত হয়ে পরাগায়ণে সমস্যা সৃষ্টি করছে। ফলে উদ্ভিদের খাদ্য উৎপাদন, বৃদ্ধি ও ফলনে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
শুধু কি প্রাণীদের সমস্যা হচ্ছে? মানুষ কি শুধু প্রযুক্তির এই উন্নতির সুবিধাই ভোগ করছে? উত্তর হলো—না। একসময় মানুষ দিনে কাজ করত, রাতে ঘুমাত। এখনকার মতো আলোর ঝলকানি ও রাত জাগার আধুনিকতার চাপে জীবনযাত্রা তখন ছিল অনেক স্বাস্থ্যসম্মত। তখন মানুষের রোগের সংখ্যা ও হতাশার পরিমাণ উভয়ই কম ছিল। কিন্তু বর্তমানে আলো দূষণের কারণে মানুষের মধ্যে ‘সময়ানুবর্তিতা’ নামের গুরুত্বপূর্ণ গুণটি ক্ষয়প্রাপ্ত হচ্ছে। ঘুমের সমস্যা, দৃষ্টিশক্তি হ্রাস, মাথাব্যথা, বিষণ্নতা, হতাশা ইত্যাদি নানা শারীরিক ও মানসিক জটিলতা বাড়ছে।
কারণ রাত তো সৃষ্টিকর্তা দিয়েছেন বিশ্রামের জন্য—দিন ও রাতের কাজ তো এক নয়। কিন্তু বর্তমানে মানুষ রাতে জেগে দিনে ঘুমাচ্ছে। কথায় আছে, “প্রকৃতি অনিয়ম পছন্দ করে না।” কৃত্রিম আলোর ব্যবহার প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়মের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এটি আমাদের জন্য ক্ষতিকর—ভালোর চেয়ে ক্ষতিই বেশি বয়ে আনছে।
শিক্ষার্থী, একাদশ বিজ্ঞান
সরকারি এডওয়ার্ড কলেজ, পাবনা
রুপপুর পারমানবিক চূল্লী , প্রফেসর মোঃ লুৎফর রহমান
The Sailor of the Seven Seas , translated by Noor-E-Alam
যে চিঠি দেবো বলে অপেক্ষায়, আতিক শাহরিয়ার
**Department of Political Science**, Professor Md. Abdul Hamid