মানব সৃষ্টির রহস্য: আল কুরআনিক পর্যালোচনা
মোঃ শামীম হোসাইন
মহান আল্লাহ মানুষ জাতিকে আশরাফুল মাখলুকাত অর্থাৎ সৃষ্টির সেরা জীব হিসেবে সৃষ্টি করেছেন। সকল সৃষ্টির সেরা জীব এবং আল্লাহর একমাত্র প্রতিনিধি হিসেবে মানুষ জাতি শ্রেষ্ঠ কাজ করবে—মহান আল্লাহ এটাই চেয়েছেন। অতঃপর এ শ্রেষ্ঠত্বকে প্রমাণিত করতে সমস্ত ফেরেশতাকুলকে প্রথম মানব হযরত আদম (আঃ) কে সিজদা করার নির্দেশ দেন। প্রতিহিংসাপরায়ণ ইবলিস ব্যতীত সকল ফেরেশতা মহান আল্লাহর নির্দেশে আদম (আঃ) কে সিজদা করার মাধ্যমে শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা করে। তখন থেকেই শুরু হয় মানুষ জাতির বিপরীতে ইবলিসের শয়তানি। ইবলিসের প্ররোচনায় আদি মানব হযরত আদম (আঃ) এবং হাওয়া (আঃ) জান্নাত থেকে বিতাড়িত হয়ে পৃথিবীতে প্রেরিত হন। পৃথিবীতে প্রেরণের পূর্বে মহান আল্লাহ মানুষকে ইবলিসের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় সর্বদা জয়ী হওয়ার জন্য জ্ঞান, বুদ্ধি, বিবেকসহ বহু পরামর্শ দান করেন। অর্থাৎ মানুষ জাতি সৃষ্টিলগ্ন থেকেই শয়তান ইবলিসের সঙ্গে প্রতিনিয়ত যুদ্ধ করে টিকে থাকতে হয়।
মহাপবিত্র গ্রন্থ আল কুরআনে একাধিক আয়াতে মানুষ জাতির সৃষ্টির আদি রহস্য, সৃষ্টির প্রক্রিয়া এবং সৃষ্টির উদ্দেশ্য বর্ণনা করা হয়েছে।
মানুষ সৃষ্টির আদি রহস্য :
হাদিসে কুদসিতে আল্লাহ ঘোষণা করেন—আমি ছিলাম গুপ্ত ও গোপন। আমার আত্মপ্রকাশের ইচ্ছা হলে অতঃপর আমি নিজেকে আত্মপ্রকাশ করলাম। নিজের ক্ষমতা ও অতুলনীয় সত্তার পরিচয় প্রকাশ করতে আল্লাহ সৃষ্টি করলেন বিশ্বজাহান। সৃষ্টি করলেন জান্নাত, জাহান্নাম, আকাশ, গ্রহ, নক্ষত্র ও ফেরেশতা। পুরো পৃথিবীকে বানালেন বাসযোগ্য এবং নির্ধারিত সময়ে জীবন নির্বাহের কেন্দ্র হিসেবে।
প্রথমে পৃথিবীতে বসবাসের জন্য সৃষ্টি করলেন জিন জাতি। কিন্তু শীঘ্রই এ জাতি আল্লাহর আদেশ অমান্য করে কুফরি ও নাফরমানিতে লিপ্ত হয়ে পড়ে। আল্লাহ এ নাফরমান জিন জাতিকে শায়েস্তা করতে পাঠালেন একদল ফেরেশতা। তারা অধিকাংশ জিনকে হত্যা করে। কিছু জিন বসতি ছেড়ে নির্জন দ্বীপ ও পাহাড়ের গুহায় আশ্রয় নেয়। জিনদের ছোট শিশু আজাজিলকে আল্লাহর নির্দেশে ফেরেশতারা হত্যা না করে নিজেদের নিকট আশ্রয় প্রদান করে। আজাজিল আল্লাহর ইবাদতে নিজেকে মশগুল করার মাধ্যমে ফেরেশতাদের মর্যাদায় উন্নীত হয়।
এই পর্যায়ে আল্লাহ তায়ালা পৃথিবীতে মানুষ সৃষ্টির নতুন পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। এ প্রসঙ্গে পবিত্র কুরআনের বাণী—
وَإِذْ قَالَ رَبُّكَ لِلْمَلَائِكَةِ إِنِّي جَاعِلٌ فِي الْأَرْضِ خَلِيفَةً ... (البقرة-৩০)
“আপনার পালনকর্তা যখন ফেরেশতাদেরকে বললেন, আমি পৃথিবীতে আমার প্রতিনিধি বানাতে যাচ্ছি, তখন তারা বলল, আপনি কি পৃথিবীতে এমন কাউকে সৃষ্টি করবেন যে সেখানে ফাসাদ সৃষ্টি করবে এবং রক্তপাত ঘটাবে? অথচ আমরা আপনার প্রশংসা ও পবিত্রতা বর্ণনা করি। আল্লাহ বললেন, নিশ্চয়ই আমি যা জানি তোমরা তা জান না।”
এই আয়াত দ্বারা মানুষের প্রতি মহান আল্লাহর মর্যাদা ও দায়িত্বের প্রমাণ পাওয়া যায়। সৃষ্টির রহস্যের সব বিষয়ে অবগত যিনি, তিনিই মানুষ সৃষ্টির চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেন। প্রথম মানব হযরত আদম (আঃ) কে সৃষ্টি করার জন্য আল্লাহর কোনো পূর্বনকশা ছিল না—শূন্য অবস্থা থেকেই তাকে সৃষ্টি করা হয়। এজন্য প্রথমে সংগ্রহ করা হয় মাটি। আজরাইল (আঃ) পৃথিবীর বিভিন্ন স্থান থেকে মাটি সংগ্রহ করেন। এর সাথে মিশানো হয় মদিনার সেই অংশের মাটি যেখানে রাসূল (সা.) কে দাফন করা হয়েছে।
অতঃপর আল্লাহ তায়ালা নিজ হাতে এই মাটি দিয়ে নিজের প্রতিনিধিত্বের যোগ্য সুন্দরতম আকৃতিতে আদম (আঃ)-এর দেহ তৈরি করেন। এ প্রসঙ্গে কুরআনের বাণী—
وَإِذْ قَالَ رَبُّكَ لِلْمَلَائِكَةِ إِنِّي خَالِقٌ بَشَرًا ... (الحجر ২৮-২৯)
“আমি পচা কাদামাটি থেকে এক মানব সৃষ্টি করব। অতঃপর তাকে সুঠাম করে গঠন করে এবং তাতে আমার পক্ষ থেকে রূহ ফুঁকে দিলে তোমরা তার সামনে সিজদায় পড়ে যেও।”
অন্য আয়াতে বলা হয়েছে—
ٱلَّذِىٓ أَحْسَنَ كُلَّ شَىْءٍ خَلَقَهُۥ وَبَدَأَ خَلْقَ ٱلْإِنسَـٰنِ مِن طِينٍ
যিনি তাঁর প্রত্যেকটি সৃষ্টিকে সুন্দর করেছেন এবং কাদামাটি থেকে মানব সৃষ্টির সূচনা করেছেন।(সিজদা-৭)। সূরা আর রাহমানের ১৪ নং আয়াতে বলা হয়েছে -خَلَقَ ٱلْإِنسَـٰنَ مِن صَلْصَـٰلٍۢ كَٱلْفَخَّارِমানুষকে(আদমকে) তিনি সৃষ্টি করেছেন পোড়ামাটির মতো শুষ্ক মাটি থেকে।
এ পর্যন্ত আলোচিত উপরের আয়াতগুলোতে স্পষ্টতই প্রতীয়মান হয় যে- মানব সৃষ্টির মূল উৎস বা সূচনার অন্যতম প্রধান উপাদান মাটি। তাই মানুষের স্বভাব ও আচরণের মধ্যে মাটির বৈশিষ্ট্য অর্থাৎ অত্যন্ত সহিষ্ণু ও শান্ত প্রকৃতি বিরাজমান। মানুষের বংশগতি, স্বভাব ও আগমন বার্তায় কোন প্রকারের পঙ্কিলতা নেই। পক্ষান্তরে ইবলিশ হলো আগুনের তৈরি অর্থাৎ তার সৃষ্টির মূল উপাদান আগুন। আগুন হলো উষ্ণ, উত্তপ্ত, প্রচন্ড গরম জাতীয় পদার্থ। কাজেই ইহা স্বভাবতঃই দুঃসহ,তাপদায়ক,দুঃখদায়ক,পীড়াদায়ক ও যন্ত্রণাদয়ক। হয়তো এই স্বভাবের বশবর্তী হয়েই ইবলিশ প্রথম মানব আদম(আ) এর প্রাধান্যে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছিলো, যা তাকে মহাপরাক্রমশালী আল্লাহ তায়ালার আদেশ অমান্য করার মত অপরিনামদর্শী স্পর্ধায় উদ্বুদ্ধ করেছিল। হযরত আদম(আ) কে সিজদার আদেশ অমান্য করে সে তার অসামান্য ভূমিকায় (মানুষকে বিভ্রান্ত করার কাজে) দৃঢ় অবস্থান গ্রহণ করে এবং এ কাজের জন্য আল্লাহর অনুমতি প্রার্থনা করে। মহান আল্লাহ তার এ প্রার্থনা অনুমোদন করেন। কারণ,মহাজ্ঞানী আল্লাহ তায়ালা সবচেয়ে ভাল জানেন যে,তাঁর বিশ্বস্ত বান্দাদের ইবলিশ কখনও বিন্দুমাত্র ক্ষতি করতে পারবে না। তিনি তাঁর সকল বান্দাকে ইবলিশের চক্রান্ত ও প্রতারণা হতে মুক্ত করার জন্য অসংখ্য নির্দেশমালা জারি করেছেন। এ প্রসঙ্গে পবিত্র কুরআনের বাণী-
وَعَلَّمَ آدَمَ ٱلۡأَسۡمَآءَ كُلَّهَا ثُمَّ عَرَضَهُمۡ عَلَى ٱلۡمَلَـٰٓئِكَةِ فَقَالَ أَنۢبِـُٔونِي بِأَسۡمَآءِ هَـٰٓؤُلَآءِ إِن كُنتُمۡ صَـٰدِقِينَ ﴿٣١﴾ قَالُوا۟ سُبۡحَـٰنَكَ لَا عِلۡمَ لَنَآ إِلَّا مَا عَلَّمۡتَنَآۖ إِنَّكَ أَنتَ ٱلۡعَلِيمُ ٱلۡحَكِيمُ ﴿٣٢﴾ قَالَ يَـٰٓـَٔادَمُ أَنۢبِئۡهُم بِأَسۡمَآئِهِمۡۖ فَلَمَّآ أَنۢبَأَهُم بِأَسۡمَآئِهِمۡ قَالَ أَلَمۡ أَقُل لَّكُمۡ إِنِّيٓ أَعۡلَمُ غَيۡبَ ٱلسَّمَـٰوَٲتِ وَٱلۡأَرۡضِ وَأَعۡلَمُ مَا تُبۡدُونَ وَمَا كُنتُمۡ تَكۡتُمُونَ ﴿٣٣﴾ وَإِذۡ قُلۡنَا لِلۡمَلَـٰٓئِكَةِ ٱسۡجُدُوا۟ لِـَٔادَمَ فَسَجَدُوٓا۟ إِلَّآ إِبۡلِيسَ أَبَىٰ وَٱسۡتَكۡبَرَ وَكَانَ مِنَ ٱلۡكَـٰفِرِينَ ﴿٣٤﴾
"আর আল্লাহ তায়ালা আদমকে শিখালেন সমস্ত বস্তুসামগ্রীর নাম। তারপর তিনি সমস্ত বস্তুকে ফেরেশতাদের সামনে উপস্থাপন করলেন। অতঃপর বললেন-আমাকে তোমরা এগুলোর নাম বলে দাও,যদি তোমরা সত্যবাদী হয়ে থাকো। তারা বলল,আপনি পবিত্র! আমরা কোন কিছুই জানি না,তবে আপনি যা আমাদেরকে শিখিয়েছেন(সেগুলো ব্যতীত),নিশ্চয়ই আপনি প্রকৃত জ্ঞান সম্পন্ন হেকমতওয়ালা। আল্লাহ বললেন,হে আদম! ফেরেশতাদেরকে এসবের নাম বলে দাও। তারপর যখন তিনি(আদম) সেসবের নাম বলে দিলেন,তখন আল্লাহ বললেন,আমি কি তোমাদেরকে বলি নি যে,আমি আসমান ও জমিনের যাবতীয় গোপন বিষয় সম্পর্কে খুব ভাল করেই অবগত আছি? আর সে বিষয়েও জানি যা তোমরা প্রকাশ কর,আর যা তোমরা গোপন কর। যখন আমি আদমকে সিজদা করার জন্য ফেরেশতাদেরকে নির্দেশ দিলাম,তখন ইবলিশ ব্যতীত সবাই সিজদা করল। সে আদেশ পালন করতে অস্বীকার করল এবং অহংকার প্রদর্শন করল।ফলে সে কাফেরদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেল। (বাকারা৩১-৩৪)
পবিত্র কুরআনের অন্যত্র এসেছে-فَسَجَدَ ٱلۡمَلَـٰٓئِكَةُ كُلُّهُمۡ أَجۡمَعُونَ ﴿٣٠﴾ إِلَّآ إِبۡلِيسَ أَبَىٰٓ أَن يَكُونَ مَعَ ٱلسَّـٰجِدِينَ ﴿٣١﴾ قَالَ يَـٰٓإِبۡلِيسُ مَا لَكَ أَلَّا تَكُونَ مَعَ ٱلسَّـٰجِدِينَ ﴿٣٢﴾ قَالَ لَمۡ أَكُن لِّأَسۡجُدَ لِبَشَرٍ خَلَقۡتَهُۥ مِن صَلۡصَـٰلٍ مِّنۡ حَمَإٍ مَّسۡنُونٍ ﴿٣٣﴾ قَالَ فَٱخۡرُجۡ مِنۡهَا فَإِنَّكَ رَجِيمٞ ﴿٣٤﴾
" তখন ফেরেশতারা সবাই মিলে সিজদা করল। কিন্তু ইবলিশ,সে সিজদাকারীদের অন্তর্ভুক্ত হতে অস্বীকার করল। আল্লাহ বললেন,হে ইবলিশ! তোমার কি হলো যে তুমি সিজদাকারীদের অন্তর্ভুক্ত হতে স্বীকৃত হলে না? ইবলিশ বলল,আমি এমন নই যে,একজন মানবকে সিজদা করবো যাকে আপনি পঁচাকর্দম থেকে তৈরি ঠনঠনে বিশুষ্ক মাটি দ্বারা সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহ বললেন,তবে তুমি এখান থেকে বের হয়ে যাও। তুমি বিতাড়িত।" (হিজর ৩০-৩৪)
মহান আল্লাহ হযরত আদম(আ) কে বিশেষ ব্যবস্থায় মাটি থেকে তৈরি করেন এবং এ মাটির তৈরি মানুষকেই আগুনের তৈরি জ্বিন ইবলিশ এবং নূরের তৈরি ফেরেশতাদের থেকে শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করে জান্নাতে বসবাস করার ব্যবস্থা করেন। তাঁর শান্তি ও নিঃসঙ্গতা দূর করার জন্য সঙ্গী হিসেবে সৃষ্টি করলেন হাওয়া(আ)কে। এখন প্রশ্ন আসতেই পারে আল্লাহ হাওয়া(আ) কে কিভাবে সৃষ্টি করলেন? এ প্রসঙ্গে মুহাম্মদ ইবনে ইসহাক বলেন,আল্লাহ তায়ালা ইবলিশকে অভিশপ্ত করার পর আদমের প্রতি মনোনিবেশ করলেন। আদম(আ)কে তন্দ্রাচ্ছন্ন করা হল এবং তাঁর বাম পাজর থেকে একটি হাড় নেওয়া হল। আর সে হাড়ে গোশত সংযোজন করা হল। তখনও আদম(আ) ঘুমিয়ে ছিলেন। তখন হাড় থেকে তার স্ত্রী হাওয়া(আ) কে সৃষ্টি করা হল এবং তাকে যথাযথ রুপদান করা হল যেন আদম(আ) তার কাছ থেকে পরিতৃপ্ত থাকেন। যখন তন্দ্রাচ্ছন্নতা কাটল এবং নিদ্রা থেকে জাগ্রত হলেন,তখন হাওয়া(আ)কে তাঁর পাশে বসা দেখলেন। সাথে সাথে তিনি বললেন,আমার গোশত,আমার রক্ত,আমার স্ত্রী।"(ইবনে কাসীর) অন্য বর্ণনায় ইবনে মাসউদ,ইবনে আব্বাস এবং অন্যান্য সাহাবী থেকে এসেছে-ইবলিশকে জান্নাত থেকে বের করা হল এবং আদম(আ) কে জান্নাতে বসবাসের সুযোগ দেওয়া হল। কিন্তু তিনি জান্নাতে একাকীত্ব অনুভব করতে থাকলেন। তারপর তাঁর চোখে ঘুম নেমে এলো,তিনি ঘুম থেকে জাগ্রত হয়ে দেখতে পেলেন যে,তাঁর মাথার পাশে একজন নারী বসে আছেন,যাকে তাঁর পাজর থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে। তিনি তাকে প্রশ্ন করলেন,তুমি কে? জবাবে বললেন,আমি একজন নারী। আদম(আ) বললেন,তোমাকে কেন সৃষ্টি করা হয়েছে? বললেন,যাতে তুমি আমার কাছে প্রশান্তি লাভ কর। তখন ফেরেশতাগণ তাকে প্রশ্ন করলেন,হে আদম! এর নাম কি? আদম(আ) বললেন,হাওয়া। তারা বলল,তাকে হাওয়া কেন নাম দেওয়া হল? তিনি বললেন,কেননা তাকে জীবিত বস্তু থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে। (তাফসীরে ইবনে কাসীর-১ম খন্ড,২৩৫)
অতঃপর মহান আল্লাহ তাঁর প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে হযরত আদম(আ) এবং হাওয়া(আ) কে সৃষ্টি করে জান্নাতে বসবাস করার জন্য নির্দেশ দিলেন। এ প্রসঙ্গে পবিত্র কুরআনের বাণী-وَقُلْنَا يَا آدَمُ اسْكُنْ أَنْتَ وَزَوْجُكَ الْجَنَّةَ وَكُلَا مِنْهَا رَغَدًا حَيْثُ شِئْتُمَا وَلَا تَقْرَبَا هَٰذِهِ الشَّجَرَةَ فَتَكُونَا مِنَ الظَّالِمِينَ ﴿١٩﴾ فَوَسْوَسَ لَهُمَا الشَّيْطَانُ لِيُبْدِيَ لَهُمَا مَا وُورِيَ عَنْهُمَا مِن سَوْآتِهِمَا وَقَالَ مَا نَهَاكُمَا رَبُّكُمَا عَنْ هَٰذِهِ الشَّجَرَةِ إِلَّا أَنْ تَكُونَا مَلَكَيْنِ أَوْ تَكُونَا مِنَ الْخَالِدِينَ ﴿٢٠﴾ وَقَاسَمَهُمَا إِنِّي لَكُمَا لَمِنَ النَّاصِحِينَ ﴿٢١﴾ فَدَلَّاهُمَا بِغُرُورٍ فَلَمَّا ذَاقَا الشَّجَرَةَ بَدَتْ لَهُمَا سَوْآتُهُمَا وَطَفِقَا يَخْصِفَانِ عَلَيْهِمَا مِن وَرَقِ الْجَنَّةِ وَنَادَاهُمَا رَبُّهُمَا أَلَمْ أَنْهَكُمَا عَنْ تِلْكَ الشَّجَرَةِ وَأَقُل لَكُمَا إِنَّ الشَّيْطَانَ لَكُمَا عَدُوٌّ مُبِينٌ ﴿٢٢﴾ قَالَا رَبَّنَا ظَلَمْنَا أَنْفُسَنَا وَإِن لَمْ تَغْفِرْ لَنَا وَتَرْحَمْنَا لَنَكُونَنَّ مِنَ الْخَاسِرِينَ ﴿٢٣﴾ قَالَ اهْبِطُوا بَعْضُكُمْ لِبَعْضٍ عَدُوٌّ وَلَكُمْ فِي الْأَرْضِ مُسْتَقَرٌّ وَمَتَاعٌ إِلَى حِينٍ ﴿٢٤﴾ فَتَلَقَّىٰ آدَمُ مِن رَّبِّهِ كَلِمَاتٍ فَتَابَ عَلَيْهِ إِنَّهُ هُوَ التَّوَّابُ الرَّحِيمُ ﴿٢٥﴾
"হে আদম! তুমি এবং তোমার স্ত্রী জান্নাতে বসবাস কর। অতঃপর সেখান থেকে যা ইচ্ছা খাও তবে এ বৃক্ষের কাছে যেও না। তাহলে তোমরা গুণাহগার হয়ে যাবে। অতঃপর ইবলিশ উভয়কে প্ররোচিত করল,যাতে তাদের অঙ্গ যা তাদের কাছে গোপন ছিল,তাদের সামনে প্রকাশ করে দেয়।সে বলল,তোমাদের পালনকর্তা তোমাদেরকে এ বৃক্ষ থেকে নিষেধ করেন নি,তবে এ কারনে যে, তোমরা না আবার ফেরেশতা হয়ে যাও কিংবা হয়ে যাও চিরকাল বসবাসকারী। সে তাদের কাছে কসম খেয়ে বলল-আমি অবশ্যই তেমাদের হিতাকাঙ্ক্ষী। অতঃপর প্রতারণাপূর্বক তাদেরকে সম্মত করে ফেলল। তারা যখন বৃক্ষ আস্বাদন করল,তখন তাদের লজ্জাস্থান তাদের সামনে খুলে গেল এবং তারা নিজের উপর বেহেশতের পাতা জড়াতে লাগল। তাদের প্রতিপালক তাদেরকে ডেকে বললেন,আমি কি তোমাদেরকে এ বৃক্ষ থেকে নিষেধ করি নি এবং বলি নি যে, শয়তান তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু? তারা উভয়ে বলল-হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা নিজেদের প্রতি জুলুম করেছি। যদি আমাদেরকে আপনি ক্ষমা না করেন এবং আমাদের প্রতি অনুগ্রহ না করেন তবে আমরা ধ্বংস হয়ে যাব। আল্লাহ বলেন,তোমরা নেমে যাও। তোমরা একে অপরের শত্রু।তোমাদের জন্য পৃথিবীতে বাসস্থান আছে এবং একটি নির্দিষ্ট মেয়াদ পর্যন্ত ফল ভোগ আছে। তোমরা সেখানেই জীবিত থাকবে,সেখানেই মৃত্যুবরণ করবে এবং সেখান থেকেই পুনরুত্থিত হবে। (আরাফ১৯-২৫)
হযরত আদম(আ) এবং তাঁর স্ত্রী হাওয়া(আ) সাময়িকভাবে বেহেশত হতে বহিস্কৃত হয়ে পৃথিবীতে অবতরণের পর আল্লাহর ইচ্ছানুযায়ী তাদের বংশবৃদ্ধি শুরু হয়। বিশ্বাবাসীর অকৃত্রিম সম্মান,শ্রদ্ধা,ভক্তি,ভালবাসা ইত্যাদির বিশুদ্ধতম আনুগত্য লাভের ব্যাপক প্রয়াসে মহান আল্লাহ মানব জন্মের সূত্রপাত ঘটান। এ পর্যায়ে এসে প্রশ্ন হতে পারে,পৃথিবীর সকল মানুষই কি মাটির তৈরি? জবাবে বলা যায়,পৃথিবীর প্রথম মানব হযরত আদম(আ) কেবল মাটি থেকে তৈরি এবং তাঁর পাজরের হাড় থেকে হাওয়া(আ) তৈরি। এ দুজনকে মহান আল্লাহ নিজ হাতে তৈরি করেছেন। পৃথিবীর অন্যান্য মানব 'নুতফাহ' (পিতা-মাতা)এর মাধ্যমে তৈরি করেছেন। এ প্রসঙ্গে পবিত্র কুরআনের বাণী-
يَا أَيُّهَا النَّاسُ اتَّقُوا رَبَّكُمُ الَّذِي خَلَقَكُم مِّن نَّفْسٍ وَاحِدَةٍ وَخَلَقَ مِنْهَا زَوْجَهَا وَبَثَّ مِنْهُمَا رِجَالًا كَثِيرًا وَنِسَاءً
"হে মানব সমাজ! তোমরা তোমাদের পালনকর্তাকে ভয় কর যিনি তোমাদেরকে এক ব্যক্তি থেকে সৃষ্টি করেছেন এবং যিনি তাঁর থেকে তাঁর সঙ্গিনীকে সৃষ্টি করেছেন। আর বিস্তার করেছেন তাঁদের দুজন থেকে অগণিত পুরুষ ও নারী।" (নিসা-১)
মানব সৃষ্টির শ্রেষ্ঠত্ব,মাহাত্ম্য,গুরুত্ব এবং এর অপরিসীম তাৎপর্যের অন্তরালে মহান স্রষ্টার পবিত্র লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য, মানব জাতির হৃদয় স্পন্দন করার জন্য পবিত্র কুরআনের অসংখ্য আয়াতের সমন্বয় ঘটেছে। সূরা ইয়াসীনের ৭৭ নং আয়াতে মহান আল্লাহ ঘোষণা করেছেন-أَوَلَمْ يَرَ الْإِنسَانُ أَنَّا خَلَقْنَاهُ مِن نُّطْفَةٍ فَإِذَا هُوَ خَصِيمٌ مُّبِينٌ মানুষ কি দেখে না যে আমি তাকে সৃষ্টি করেছি এক ফোঁটা নাপাক পানি থেকে।
আরও বিস্তারিত তথ্যসহ সূরা হজ্জের ৫ নং আয়াতে মহান আল্লাহ ঘোষণা করেছেন-يَا أَيُّهَا النَّاسُ إِن كُنتُمْ فِي رَيْبٍ مِّنَ الْبَعْثِ فَإِنَّا خَلَقْنَاكُم مِّن تُرَابٍ ثُمَّ مِن نُّطْفَةٍ ثُمَّ مِنْ عَلَقَةٍ ثُمَّ نُخْرِجُكُمْ طِفْلًا ثُمَّ لِتَبْلُغُوا أَشُدَّكُمْ
হে লোক সকল! আমি তোমাদেরকে মৃত্তিকা থেকে সৃষ্টি করেছি,এরপর এক ফোঁটা নাপাক পানি থেকে, এরপর জমাট রক্ত থেকে, এরপর পূর্ণাকৃতি বিশিষ্ট ও অপূর্ণাকৃতি বিশিষ্ট গোশত পিন্ড থেকে তোমাদের কাছে ব্যক্ত করার জন্য।
উপরের আয়াতগুলোতে মানবের মর্যাদা ও মাহাত্ম্যের প্রতীক স্বরুপ মহান আল্লাহর সৃষ্টি প্রক্রিয়ায় রয়েছে উচ্চতর কলাকৌশল। মানব শিশু তার জন্মলগ্নে মাতৃগর্ভে ক্ষুদ্রাকৃতির এক গোশত পিন্ডের মত দেখায়। কেন্দ্রস্থলটি মানবাকৃতির মত দেখালেও তখন আলাদা করে কিছুই বুঝা যায় না। পরবর্তীতে গোশত পিন্ডটি ক্রমান্বয়ে বিভিন্ন পর্যায় অতিক্রম করে বৃদ্ধি পেতে থাকে। প্রবৃদ্ধির বিভিন্ন পর্যায়েই গঠিত হতে থাকে মানব শিশুর হাড়ের কাঠামো,পেশী,স্নায়ুতন্ত্রসহ বিভিন্ন অঙ্গ। মানব সৃষ্টির নিভৃতে যে গোপনীয় গূঢ় রহস্য বিদ্যমান,সে বিষয়ে মহান আল্লাহ ঘোষণা করেন-وَلِلَّهِ مُلْكُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ ۗ يَخْلُقُ مَا يَشَاءُ وَيَهْبُ مَا يَشَاءُ مِنَ الْأُنْثَىٰ وَمَا يَشَاءُ مِنَ الذُّكُورِ
"নভোমণ্ডল ও ভূমন্ডলের রাজত্ব আল্লাহ তায়ালারই।তিনি যাকে ইচ্ছা সৃষ্টি করেন,যাকে ইচ্ছা কন্যা সন্তান এবং যাকে ইচ্ছা পুত্র সন্তান দান করেন।"(শুরা-৪৯)
মানুষের সৃষ্টির উদ্দেশ্য:
মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রতিনিধিত্বের সার কথা হলো যারা ইসলামী সংস্কৃতি ও সভ্যতার উন্নযন, বিকাশ, জীবন ও সম্পত্তির নিরাপত্তা বিধান, প্রতিভার বিকাশ সাধন, সৃজনশীল চিন্তার পুনর্গঠনের মাধ্যমে জ্ঞান-বিজ্ঞান, বীরত্বে নৈতিক উৎকর্ষ সাধন করে ধর্ম-কর্মে সাধুতা দিযে মানব কীর্তিকে সমৃদ্ধ করা। আল্লাহর প্রতিনিধি তার ব্যক্তি জীবন, পারিবারিক জীবন, সমাজ জীবন তথা রাষ্ট্রীয জীবনের যে পদে কিংবা যে পেশায় নিযোজিত থাকুক না কেন-সর্বাবস্থায আল্লাহ প্রদত্ত আইন, বিধি-বিধান তথা আদেশ-নিষেধ-উপদেশ কুরআনে বর্ণিত দিক-নির্দেশনার প্রচার-প্রসার ও প্রতিষ্ঠায় আন্তরিকভাবে সচেষ্ট থাকবে।আল্লাহ মানুষকে সৃষ্টির সেরা জীব হিসেবে তৈরি করেছেন। তাদের এই শ্রেষ্ঠত্ব যাতে উপলব্ধি করা যায়, সেজন্য মানুষকে সৌন্দর্যমন্ডিত করা হয়েছে। মানব সন্তানের বাহ্যিক অবকাঠামো ও রূপ সৌন্দর্যের বর্ণনা দিয়ে মহান আল্লাহ বলেন, لقَدْ خَلَقْنَا الْإِنسَانَ في أحْسَن تقويم
'আমি মানুষকে অতি সুন্দর অবয়বে সৃষ্টি করেছি' (সুরা ত্বিন- ৪)। আল্লাহ তায়ালা আরও ইরশাদ করেন, هُوَ الَّذِي يُصَوِّرُكُمْ فِي الأرْخام كيف يشاء لا إله إلا هو العزيز الحكيم
তিনিই তো ওই সত্তা যিনি তোমাদেরকে মায়েদের গর্ভে নিজের ইচ্ছামতো আকৃতি গঠন করেন। তিনি ব্যতীত আর কোনো উপাস্য নেই। তিনি পরাক্রমশালী প্রজ্ঞাময়' (আল ইমরান ৬)।
আল্লাহ তায়াল বলেন "অবশ্যই মানুষ এমন একটি সময (পেরিযে) এসেছিল, যখন সে উল্লেখযোগ্য কিছুই ছিল না" (সূরা দাহর, ১)। কিছুই ছিলনা অথচ মহান আল্লাহ তাকে অস্তিত্ব দান করেছেন। এই আযাতে মানুষের অহঙ্কার ও দাম্ভিকতা থেকে বিরত থাকতে বলা হযেছে, এর পরেও কেউ অহঙ্কার করলে ইবলিসের দলভুক্ত গণ্য হবে। আল্লাহ বলেন, আমার নির্দেশ আসার পর কে উত্তম কে অধম সেই চিন্তা করার সাহস কে দিল তোমাকে।
মানুষের সৃষ্টির মর্যাদা :
সৃষ্টির সেরা জীব হিসেবে আল্লাহ তায়ালা মানুষকে সম্মানিত করেছেন এবং সীমাহীন নিয়ামত দিয়ে ধন্য করেছেন। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন, ولَقَدْ كَرَّمْنَا بَنِي أدم وحَمَلْنَاهُمْ فِي الْبَرِّ وَالْبَحْرِ وَرَزَقْنَاهُمْ مِنَ الطَّيِّبَاتِ وَفَضَّلْنَاهُمْ عَلَى كَثِيرٍ مِمَّنْ خَلَقْنَا تَفْضِيلًا
নিশ্চয়ই আমি আদম সন্তানকে মর্যাদা দান করেছি, আমি তাদেরকে স্থলে ও জলে চলাচলের বাহন দান করেছি; তাদেরকে উত্তম জীবনোপকরণ প্রদান করেছি এবং তাদেরকে অনেক সৃষ্ট বস্তুর উপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছি, (সূরা বনি ইসরাইল, ৭০)।
প্রথমত, যে আকার-আকৃতি ও সামঞ্জস্যপূর্ণ শারীরিক কাঠামো মহান আল্লাহ মানুষকে দান করেছেন, তা অন্য কোনো সৃষ্টবস্তুকে দেওয়া হয়নি।দ্বিতীয়ত, যে জ্ঞান মানুষকে দেওয়া হয়েছে, যার দ্বারা তারা নিজেদের জীবন গতিশীল করার জন্য নিত্যনতুন বস্তু আবিষ্কার করেছে, অন্য কোনো সৃষ্টবস্তুকে তা দেওয়া হয়নি।তৃতীয়ত, মানুষকে আসমানি ওহি দেওয়া হয়েছে। এই জ্ঞান দিয়ে তারা কল্যাণ-অকল্যাণ, উপকারী-অপকারী ও ভালো-মন্দের মধ্যে পার্থক্য করতে সক্ষম।চতুর্থত, মানুষকে একধরনের বিশেষ জ্ঞান দেওয়া হয়েছে, যার মাধ্যমে সে আল্লাহর অন্য সৃষ্টবস্তু থেকে উপকৃত হতে ও বশে রাখতে সক্ষম। আল্লাহর কিছু সৃষ্টবস্তু এমন আছে, যেগুলোর শক্তিমত্তার কথা ভেবেও মানুষ কিংকর্তব্যবিমূঢ়। অথচ মহান আল্লাহ সেগুলোও মানুষের কল্যাণে নিয়োজিত করেছেন। যেমন-চাঁদ, সূর্য, বাতাস, পানি মানুষের বশে নেই, কিন্তু দিব্যি এগুলো মানুষের কল্যাণে নিয়োজিত।আমরা মহান আল্লাহর শ্রেষ্ঠ জীব। জন্ম-মৃত্যু, সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা, চিন্তা-গবেষণা, মনোযোগ-অমনোযোগ ইত্যাদি আমাদের নিত্যসঙ্গী।তন্মধ্যে চিন্তা-ভাবনা, বিবেক-বিবেচনা দ্বারা সত্য ধর্ম ইসলামে প্রতিষ্ঠিত থাকাই হল আমাদের শ্রেষ্ঠ দায়িত্ব ও কর্তব্য। অনাকাংখিত অসংখ্য অশুভ তৎপরতা হতে আত্মরক্ষার জন্য আল্লাহ তায়ালা তাঁর সুনির্দিষ্ট বিধানাবলী প্রদান করেছেন। তন্মেধ্যে জন্ম-মৃত্যু নিয়ে গভীর চিন্তা করা উক্ত বিধানাবলীর একটা অবিচ্ছেদ্য অংশ। মানুষ তার জ্ঞান-বিজ্ঞান, শিক্ষা-দীক্ষা, পান্ডিত্য-প্রতিভা, অর্থ-সম্পদ, প্রভাব-প্রতিপত্তি, বিবেক-বিবেচনা প্রভৃতি গুণাবলীর মাঝে নিজের জন্ম বৃত্তান্তের অনুসন্ধান করুক, অতঃপর নিজের করণীয় বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করুক, এটাই হল মহান আল্লাহ তায়ালার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ উপদেশমালা।
প্রভাষক, আরবি ও ইসলামিক শিক্ষা, সরকারি এডওয়ার্ড কলেজ, পাবনা।