Splash

জন ডিউঈ (1859–1952) একজন বিখ্যাত আমেরিকান প্রয়োগবাদী দার্শনিক ও শিক্ষাবিদ। তিনি গণতান্ত্রিক ও বিজ্ঞানমনস্ক একজন মানুষ। তাঁর শিক্ষাতত্ত্ব তাঁর জীবনদর্শনের প্রকাশ। তাঁর শিক্ষাদর্শনের প্রভাব বিশ্বব্যাপী। তিনি তাঁর প্রয়োগবাদী চিন্তাগুলোকে কেবল জ্ঞানতাত্ত্বিক, অধিবিদ্যক কিংবা নৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিতে নয়, শিক্ষাতত্ত্বেও প্রয়োগ করেন। তাঁর শিক্ষাতত্ত্ব গণতান্ত্রিক বিশ্বাস এবং বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির উপর নির্ভরশীল। সমাজ-জীবনের আদর্শ ও উপযোগিতার সাথে তাঁর শিক্ষাতত্ত্ব নিবিড়ভাবে সম্পর্কিত। শিক্ষার্থীর আগ্রহ, ইচ্ছা ও ক্রিয়াশীলতা তাঁর শিক্ষাদর্শনের কেন্দ্রবিন্দু। ডিউঈ তাঁর জ্ঞানতাত্ত্বিক ও নৈতিক চিন্তাগুলোকে আমাদের নিরন্তর অভিজ্ঞতার উপর নির্ভর করে চিত্রিত করেছেন এবং দার্শনিক পটভূমিতে তিনি তাঁর শিক্ষাদর্শন বিকাশের চেষ্টা করেছেন। তাঁর দর্শনের একটি প্রভাবশালী দিক হলো এই যে, শিক্ষাতত্ত্ব অভিজ্ঞতার উপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে। এই প্রবন্ধটি জন ডিউঈর শিক্ষাগত চিন্তাভাবনা এবং এর প্রভাব ও প্রাসঙ্গিকতা মূল্যায়নের একটি প্রয়াস মাত্র। জন ডিউঈ ডারউইনের বিবর্তনবাদ, বিশেষ করে পর্যবেক্ষণ ও পরীক্ষণ পদ্ধতি দ্বারা ভীষণভাবে প্রভাবিত হয়েছিলেন। স্ট্যান্নি হল্ এর সমাজতাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং পার্সের প্রয়োগবাদী মতবাদ তাঁর মনে গভীর রেখাপাত করে। ডিউঈ নৈতিক মূল্যবোধের ট্রান্স-আমেরিকান ভিত্তি প্রত্যাখ্যান করেন। তাঁর মতে নৈতিকতা ক্রমবর্ধমান পরিবর্তনশীল। নির্দিষ্ট এবং চূড়ান্ত নৈতিকতা বলে কিছু নেই। প্রয়োগবাদ অনুসারে সত্য স্থির বা অপরিবর্তনীয় নয়; বরং সত্য জীবনের প্রয়োজনের সাথে সম্পর্কিত। সত্য কার্যসাধনের হাতিয়ার। মানুষ প্রতিনিয়ত সমাজের মধ্যে নতুন নতুন মূল্যবোধ সৃষ্টি করে চলেছে। ডিউঈ জ্ঞানের ক্ষেত্রে একজন মুক্তমনা মানুষ। জ্ঞান ও চিন্তার জগতে তিনি জাতিভেদ বিরোধী। তাঁর মতে শিক্ষা হবে স্বাধীন ও গণতন্ত্রসম্মত। গণতন্ত্র এমন এক সমাজব্যবস্থা যেখানে সবাই অংশগ্রহণ করতে পারে। গণতন্ত্র শুধু রাজনৈতিক ব্যবস্থা নয়, বরং এর চেয়েও বেশি কিছু। ডিউঈ বলেন, “A democracy is more than a form of government; it is primarily a mode of associated living, of conjoint communicated experience.” (John Dewey, Democracy and Education, New Delhi: Light and Life, 1967, p. 87)। ডিউঈ গণতন্ত্রের পূর্ণ অর্থ খুঁজে পেয়েছেন তাঁর সমাজদর্শনের নৈতিক তাৎপর্য এবং নীতিবিদ্যার সামাজিক তাৎপর্যের সমন্বয়ের মাধ্যমে। ডিউঈ বলেন, “But if democracy has a moral and ideal meaning, it is that a social return be demanded from all and that opportunity for development of distinctive capacity be afforded all.” (পূর্বোক্ত, p. 122)। শিক্ষার সাথে সমাজজীবনের এক নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। মানবসমাজের স্থায়ী কল্যাণ তথা একটি জাতির উন্নতি ঐ সমাজের শিক্ষা-ব্যবস্থার বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গির উপর নির্ভরশীল। শিক্ষা একটি সামাজিক প্রক্রিয়া। ডিউঈ মূলত এর মাধ্যমে একটি দলগত কাজ সম্পন্ন করতে চান। এই কাজটি হবে আনন্দদায়ক, পারস্পরিক সহযোগিতামূলক, সহনশীল মনোভাবাপন্ন, উদার গণতান্ত্রিক এবং বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গিসম্পন্ন। জ্ঞান, দক্ষতা, দৃষ্টিভঙ্গি, অসাম্প্রদায়িক মনোভাবসম্পন্ন, দেশপ্রেমবোধসম্পন্ন, প্রযুক্তিজ্ঞাননির্ভর, নৈতিক মূল্যবোধসম্পন্ন বিশ্বমানের নাগরিক হয়ে পরিবর্তনশীল বিশ্বব্যবস্থার মোকাবিলায় শিক্ষার্থীরা গড়ে উঠবে। শিক্ষক শুধু সহায়কের ভূমিকা পালন করবেন। আত্মবিশ্বাসসম্পন্ন শিক্ষক শিক্ষার্থীর অভিপ্রায় বুঝতে সক্ষম হবেন এবং শিক্ষার্থীকে যথাযথভাবে নির্দেশনা দিতে পারবেন। শিক্ষা সামাজিক নানা ফাংশন হিসেবে কাজ করে। মানবজীবনে এবং সমাজজীবনে প্রতিনিয়ত আমরা নানা সমস্যার সম্মুখীন হই। কিছুদিন আগেই বৈশ্বিক সমস্যা হিসেবে করোনা ভাইরাসের মোকাবিলা করতে হয়েছে বিশ্ববাসীকে। সমগ্র পৃথিবীর শিক্ষালয় এবং গবেষণাগারের কাজ ছিল এর প্রতিষেধক টিকা আবিষ্কারের প্রচেষ্টা। মানুষ অল্প সময়ের মধ্যে এ ক্ষেত্রে সফল হয়েছে। জড়ের স্বরূপ আবিষ্কার পদার্থবিজ্ঞানীদের দীর্ঘদিনের আকাঙ্ক্ষা। এ বছর নোবেল বিজয়ী পদার্থবিদরা অ্যাটোসেকেন্ড ইলেকট্রনে আলোর প্রতিফলন ফেলে তার স্বরূপ নির্ণয়ে সফল হন। এভাবে সমাজের মধ্যে মানুষ যত জিজ্ঞাসা বা প্রশ্নের সম্মুখীন হচ্ছে, যত সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে—তার সমাধানের চেষ্টা করছে এবং গবেষণায় সফল হচ্ছে। তাই ডিউঈ বলেছেন, ইতিহাস, সমাজবিজ্ঞান, গণিত, বিজ্ঞান—এরূপ বিষয়ভিত্তিক পড়াশোনা কখনও এককভাবে কোনো জাতির উন্নতি করতে পারে না। ডিউঈর দৃষ্টিভঙ্গি সমন্বয়বাদী, বৈজ্ঞানিক ও গতিশীল। সমাজচেতনার মাধ্যমে সামনে এগিয়ে যাওয়ায় তিনি বিশ্বাসী। তিনি প্রগতিবাদী ও জীবনমুখী। তাঁর শিক্ষাতত্ত্ব আধুনিক ও মানবতাবাদী। সামাজিক জীবনের ইতিবাচক বিকাশের মধ্যেই তিনি শিক্ষার সার্থকতা খুঁজে পান। ডিউঈর কার্যবাদী প্রয়োগবাদ অনুযায়ী কোনো ধারণা বা বক্তব্যের স্থির সত্য বলে কিছু নেই। সত্য প্রতিনিয়ত পরিবর্তনশীল। সত্য প্রয়োগের মাধ্যমে কার্যসাধনের হাতিয়ার মাত্র। কোনো ধারণা সমাজের জন্য কল্যাণকর হলে তা সত্য বলে গণ্য হবে, আর কল্যাণকর না হলে তা সত্য বলে গণ্য হবে না। তাহলে চিরস্থায়ী সত্য বলে কিছু অবশিষ্ট থাকে না; সত্য আপেক্ষিক হয়ে পড়ে। মানুষের যে অতীত মূল্যবোধের উপর সমাজ টিকে থাকে, ডিউঈর শিক্ষাতত্ত্ব সেই চিরন্তন মূল্যবোধকে অস্বীকার করে। ডিউঈ বিজ্ঞানমনস্কতার উপর জোর দেন এবং ধর্মীয় ও নৈতিকতার কোনো চূড়ান্ততা স্বীকার করেন না। সমাজের বাস্তব সমস্যার সমাধানের উপর জোর দিতে গিয়ে এই তত্ত্ব শিল্প-সাহিত্যের কিছুটা অবহেলা করে। ডিউঈর বিজ্ঞানমনস্কতার সাথে চিরন্তন সামাজিক মূল্যবোধের সমন্বয়ের মাধ্যমে এমন একটি শিক্ষা-ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব, যা আজকের মানুষের সত্যিকার মুক্তির দিশারী হতে পারে।
অধ্যাপক, দর্শন বিভাগ সরকারি এডওয়ার্ড কলেজ, পাবনা
asus