**শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি** মোঃ রাকিবুল ইসলাম রাকিব একটি দেশের প্রাণশক্তি হলো তার তরুণ প্রজন্ম। আর এ প্রজন্মের গড়ে ওঠার প্রধান ক্ষেত্র হলো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যখন বিভিন্ন মত ও পথের শিক্ষার্থী একসঙ্গে জ্ঞানচর্চা করে, তখন তাদের মধ্যে একটি আত্মিক বন্ধন তৈরি হয়। এ বন্ধনকে সুদৃঢ় রাখাই হলো সম্প্রীতি, যা একটি আধুনিক ও স্থিতিশীল রাষ্ট্র গঠনের মূল ভিত্তি। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি মানে হলো ভিন্ন ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে পারস্পরিক সহনশীলতা, শ্রদ্ধা এবং শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান। আর এই সম্প্রীতির শিক্ষা অর্জনের শ্রেষ্ঠ স্থান হলো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। মানুষে মানুষে পারস্পরিক মিল ও সৌহার্দ্য সমাজকে সুন্দর ও বাসযোগ্য করে তোলে। বাংলাদেশ প্রাচীনকাল থেকেই সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ। এ দেশের মাটিতে জন্ম নিয়েছে নানা ধর্ম ও বর্ণের মানুষ। তারা নানা প্রতিকূলতার মাঝেও শত শত বছর ধরে সুখে-দুঃখে একে অপরের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে বসবাস করছে। একটি দেশের উন্নয়নের জন্য স্থিতিশীলতা প্রয়োজন। আর এই স্থিতিশীলতার মূলে রয়েছে জাতীয় ঐক্য। যখন বিভিন্ন ধর্মের ও মতের মানুষ একে অপরকে ঘৃণা না করে শ্রদ্ধা করতে শেখে, তখনই একটি দেশ উন্নতির পথে দ্রুত এগিয়ে যেতে পারে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কেবল পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান বিতরণের জায়গা নয়; এটি যুক্তিবাদী ও সহনশীল ‘মানুষ’ গড়ার কারখানা। এখানে শিক্ষার্থীরা যদি সম্প্রীতির মূল্য বুঝতে পারে, তবে তারা সুনাগরিক হিসেবে গড়ে উঠবে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সম্প্রীতি বজায় থাকলে সমাজে হানাহানি ও সহিংসতা কমে এবং মানবিক মূল্যবোধের বিকাশ ঘটে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হলো সমাজের একটি ক্ষুদ্র রূপ। এখানে যেমন ধনী-দরিদ্রের ভেদাভেদ থাকে না, তেমনি ধর্ম-বর্ণের বিভেদও থাকে না। একই বেঞ্চে বসে হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা করে। তারা একই মাঠে খেলাধুলা করে, বিভিন্ন অনুষ্ঠানে, সভায়, কর্মশালায় বা আড্ডায় অংশগ্রহণ করে। এই যে পারস্পরিক মেলামেশা, এটিই শিক্ষার্থীদের মধ্যে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বীজ বপন করে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন কার্যক্রমের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের শেখায় যে, “সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই।” শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, বিতর্ক প্রতিযোগিতা এবং ক্রীড়া প্রতিযোগিতার আয়োজন সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বৃদ্ধিতে সহায়ক। যখন কোনো শিক্ষার্থী দলীয়ভাবে কাজ করে, তখন সে সহপাঠীর ধর্ম চিন্তা করে না; বরং দলের সাফল্যের জন্য এক হয়ে কাজ করে। বার্ষিক মিলনমেলা বা বনভোজনের মতো অনুষ্ঠান শিক্ষার্থীদের মধ্যে সামাজিক বন্ধন দৃঢ় করে। এসব কার্যক্রমের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে শেখে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হলো আলোর পথযাত্রীদের মিলনস্থল। এই আলো তখনই উজ্জ্বল হয়, যখন সেখানে সাম্প্রদায়িকতার অন্ধকার অনুপস্থিত থাকে। আমাদের মনে রাখতে হবে যে, বৈচিত্র্যের মধ্যেই ঐক্য নিহিত, আর এই ঐক্য থেকেই জন্ম নেয় শান্তি ও সৌন্দর্য। একটি সুন্দর বাগানে যেমন নানা রকম ফুল থাকে, তেমনি একটি সুন্দর দেশেও নানা ধর্মের ও মতের মানুষ থাকবে। এই সত্যকে স্বীকার করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সম্প্রীতি ও সহনশীলতার চর্চা যত বেশি হবে, সমাজ ও রাষ্ট্র তত বেশি মানবিক ও শান্তিময় হয়ে উঠবে। বাংলাদেশের সংস্কৃতির সবচেয়ে শক্তিশালী দিক হচ্ছে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও শুভবোধ। তবে দেশি-বিদেশি নানা অপশক্তি এটিকে নষ্ট করতে চায়। এ বিষয়ে আমাদের সকলকে সতর্ক থাকতে হবে। একটি সুন্দর ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে হলে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির কোনো বিকল্প নেই। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান যদি কেবল সার্টিফিকেট দেওয়ার কারখানা না হয়ে প্রকৃত মানুষ গড়ার কেন্দ্র হয়, তবে এ দেশে কোনো দিন সাম্প্রদায়িক শক্তির উত্থান হবে না। আমাদের মনে রাখতে হবে—ধর্ম যার যার, কিন্তু দেশ সবার। যদি সম্প্রীতির এই আলো ছড়িয়ে পড়ে প্রতিটি শিক্ষার্থীর হৃদয়ে, তবে আমাদের স্বাধীনতা ও মুক্তি সার্থক হবে। **লেখক:** শিক্ষার্থী, স্নাতক (তৃতীয় বর্ষ) সভাপতি, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল সরকারি এডওয়ার্ড কলেজ শাখা, পাবনা