**রোদেলা স্মৃতি**
অরিয়ন এইচ রাফি দুপুরগুলো কখন যে বদলে গেল, ঠিক বুঝতে পারিনি। ছোটবেলায় আমাদের বাড়ির জানালার ধারে একটা বড় আমগাছ ছিল। গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে হাওয়া এলে মা আমাকে কোলে নিয়ে ঘুম পাড়াতেন। মনে হতো, পুরো পৃথিবীটা যেন মায়ের বুকের ভেতরে আছে। সেই শান্তি, সেই নিশ্চয়তা বড় হতে হতে কোথায় যেন হারিয়ে গেল। জীবন যত এগোয়, মানুষ তত ব্যস্ত হয়ে যায়। কিন্তু মায়ের দিক থেকে সেই দূরত্বটা কেমন অনুভূত হয়, তা নিয়ে আমরা খুব কম ভাবি। আমাদের মনে হতো, মা চুপচাপ আছেন, শুধু আমাদের জন্য, সব সময়। কিন্তু বড় হতে হতে বুঝতে পারিনি, মা কতটা একা হয়ে গেছেন। আমি কলেজে উঠলাম। ক্লাস, কুইজ এবং বন্ধু—সব মিলিয়ে সময় দ্রুত পার হচ্ছিল। মা নিয়ম করে ফোন করতেন। কখনো দুপুরে, কখনো রাতে। আমি ফোন ধরেই বলতাম, “মা, পরে কথা বলি, একটু ব্যস্ত আছি।” মা হাসতেন, “ঠিক আছে, খেয়ে নিস, বেশি করে পানি খাস।” কিছুদিন পরে দেখলাম, মা আর ফোনে বিরক্ত করেন না। মাঝে মাঝে শুধু একটা ছোট মেসেজ পাঠান, খেয়েছি কি না তা জানার জন্য। আমি উত্তর দিই বা না দিই, মায়ের কোনো অভিযোগ থাকে না। আবার কখনো দেখি, তিনি জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছেন, যেন কেউ আসবে বলে অপেক্ষা করছেন। একদিন কলেজ থেকে ফিরতে ফিরতে মনে হলো অনেক দিন মায়ের সাথে দেখা করতে যাইনি। কোনো বিশেষ কারণ ছিল না, কিন্তু বুকটা হালকা খচখচ করছিল। হঠাৎ আগের সেই আমগাছ, দুপুরের আলো, মায়ের মুখ—সব মনে পড়লো। মনে হলো, এসব হারিয়ে যাচ্ছে, আর আমি সেটা অনুভবই করছি না। বাড়িতে পৌঁছে দেখি মা বারান্দায় একা বসে আছেন। চুলে সাদা রঙটা একটু বেড়েছে। মুখটা আগের মতোই শান্ত, কিন্তু সেই শান্তির মধ্যে এক ধরনের ক্লান্তি লুকিয়ে আছে। — “কি মা, বারান্দায়?” — “রোদটা ভালো লাগছিল। ভাবলাম একটু বসি।” আমি তখন বুঝিনি—এই “রোদ ভালো লাগা” কথার ভেতরে কতটা একাকীত্ব লুকিয়ে থাকে। হঠাৎ মনে হলো, কতদিন ধরে মা শুধু রোদ নিয়েই সন্তুষ্ট, আর আমি দৌড়ঝাঁপের মধ্যে এই ছোট ছোট মুহূর্তগুলোকে উপেক্ষা করেছি। সেদিন দুপুরে মা নিজের হাতে রান্না করলেন আমার জন্য। — “তোকে নিয়ে খেতে বসি না কতদিন হলো।” আমি কিছু বললাম না। শুধু দেখলাম, আমার জন্য ভাজা মাছটা প্লেটে তুলতে গিয়ে মা হাতটা একটু কাঁপিয়ে ফেললেন। — “হাত ঠিক আছে তো?” — “বয়স তো হলো রে বাবা, একটু কাঁপে।” আলতো করে আমি তাঁর হাতটা ধরলাম। এত বছরেও মায়ের হাতটা ঠিক একই রকম নরম। মনে হলো, এই হাতেই আছে সেই সমস্ত স্মৃতি—শৈশব, বৃষ্টির দিন, কিংবা রাতের গল্প—সব! খেতে খেতে মা বললেন, “তোর ঘরটা আমি পরিষ্কার করে রাখি। যখন খুশি এসে থাকিস।” আমি তখন ভাবলাম, মা কেন এমন বলছে? যেন খুব চান আমি ফিরে আসি, কিন্তু বলতে পারছেন না। আমি হেসে বললাম, “ঠিক আছে মা।” তবে মনের ভেতরে কিছু একটা চেপে বসেছিল। সন্ধ্যার দিকে আমি বারান্দায় বসেছিলাম। মা চুপচাপ পাশে এসে বসে বললেন, “জীবন যত ব্যস্ত হোক, মাঝে মাঝে নিজের মানুষগুলোর কথা ভাববি। তোর কাছে হয়তো এটা ছোট বিষয়, কিন্তু তোদের কথা ভেবেই হয়তো কাছের মানুষের দিন কাটে।” আমি চলে আসার সময় মা দরজার সামনে দাঁড়িয়ে বললেন, “ফিরে গিয়ে ঠিকঠাক খাস। আর নিজে বেশি চাপ দিবি না।” কয়েক সপ্তাহ পরে মা চলে গেলেন। একটা নরম দিনের মতো, চুপচাপ, শান্তভাবে। হাসপাতাল থেকে ফোন এলো, কিন্তু পৌঁছাতে পৌঁছাতে সব শেষ! মায়ের নিঃশব্দ চলে যাওয়াটা আমাকে সেদিন প্রথম বুঝতে দিল—মা আসলে অনেকদিন ধরেই ভেতরে ভেতরে লড়ছিলেন। আমাদের না বলা কথাগুলো, দূরত্বগুলো, অবহেলাগুলো তাঁকে ভেতর থেকে ভাঙছিল। সবকিছুর একটা সময় থাকে। আর সময় কারো জন্য দাঁড়ায় না। আমি মায়ের ঘরে ঢুকে দেখলাম, আমার ছোটবেলার ছবি, আমার কলেজের আইডি কার্ড, আর একটা নোটে লেখা— “সময় হলে বাসায় আসিস। দুপুরে রোদ ভালো থাকে।” এই এক লাইনে কতটুকু মমতা, কতটুকু অপেক্ষা, আর কতটা না বলা ভালোবাসা ছিল—আমি তখন বুঝলাম। কয়েক দিন পরে বারান্দায় দাঁড়িয়ে রোদের দিকে তাকিয়ে থাকলাম। হঠাৎ মনে হলো, মা পাশে দাঁড়িয়ে আছেন—শান্ত, স্থির, নরম হাসি নিয়ে। মনে হলো, মা বলছেন, “আমি থাকি তোর কাছেই।” আজও আমি মাঝে মাঝে দুপুরের রোদে চোখ বন্ধ করি। মনে হয়, মা হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন। শুধু এবার আমার চোখ খুলে যায় খুব দ্রুত—কারণ জানি, সেই আলোটা আর আগের মতো নেই। সেই রোদ, সেই বাতাস, সেই ছোট্ট সুখ—সব কিছু এখন শুধু স্মৃতি। বারান্দায় দাঁড়িয়ে আমি মায়ের কথা মনে করি—তার নিঃশব্দ ভালোবাসা, তার অপেক্ষা, তার একাকীত্ব। মনে হয়, যদি আরও সময় পেতাম, হয়তো আমি তার জন্য আরও কিছু করতে পারতাম, আরও কথা বলতে পারতাম, আরও কাছে থাকতে পারতাম। তবুও আমি বারান্দায় দাঁড়াই। কারণ আমি জানি, মায়ের ভালোবাসা কোথাও যায় না। আমাদের হারিয়ে যাওয়া দুপুরগুলোতে লুকিয়ে থাকে সবসময়—নিঃশব্দে, তবু গভীরভাবে। --- লেখক: শিক্ষার্থী, স্নাতক (সম্মান), দ্বিতীয় বর্ষ, অর্থনীতি বিভাগ, সরকারি এডওয়ার্ড কলেজ, পাবনা