
**স্মৃতির ছায়া** আতিকা খাতুন আমি তখন ক্লাস নাইনে পড়ি। আমাদের বান্ধবীদের ছোট্ট একটা দুনিয়া ছিল। সেই দুনিয়ায় আমরা ছিলাম আটজন। আমি, রহিমা, আয়শা, রিতু, সাথী, রত্না, কুসুম আর হীরা। সকাল থেকে সন্ধ্যা অবধি প্রায় সব সময় আমরা একসাথে থাকতাম। সকালে স্কুল, বিকেলে প্রাইভেট, শুধু রাতে আলাদা। একজন না এলে পুরো দল মিলে চলে যেতাম তাকে আনতে। নতুন স্কুল, নতুন ব্যাচ, টিচাররাও আমাদের ভীষণ ভালোবাসত। মনে হতো আমরা যেন এক পরিবার, একে অপরের নিঃশ্বাসের মতো কাছের। কিন্তু একদিন সেই নির্দোষ আনন্দে হঠাৎ নেমে এলো অদ্ভুত এক অশরীরী ছায়া। আয়শা স্কুলে আসেনি। আমরা গেলাম তার বাড়ি। ঘরে ধূপের গন্ধ, ঝাড়ফুঁকের শব্দ। ওঝা চেষ্টা করছেন। শুনে সবার বুক কাঁপল, কিন্তু কৌতূহলও কাজ করছিল। কয়েকদিন পর আয়শা আবার স্কুলে এলো। প্রথমে সব স্বাভাবিক। কিছুক্ষণ পর হঠাৎ একদম নিস্তব্ধ হয়ে গেল। আমাদের দিকে অদ্ভুত বাঁকা চোখে তাকাতে লাগল। আমরা কেঁপে কেঁপে বললাম— — আয়শা, তুমি ঠিক আছ তো? ও চুপ! চোখে অদ্ভুত লালচে চকচকে ভাব। হঠাৎ এক গম্ভীর কণ্ঠ বেরোল— — আমি আয়শা নই। আমরা সবাই একসাথে চেঁচিয়ে উঠলাম— — কী বলছ আয়শা? কেয়া ম্যাম এসে শান্ত গলায় বললেন, “শান্ত হও, আমি দেখছি কী হয়েছে।” ওর চোখে অদ্ভুত এক আগুন জ্বলে উঠল— — আমি ওকে ছাড়ব না, আমি ওকে নিয়ে যাব। ম্যাম হালকা হলেও দৃঢ় গলায় বললেন— — তুমি যা চাও তাই দেব, কিন্তু ওকে ছেড়ে দাও। ও ঠোঁট বাঁকিয়ে হেসে উঠল— — আমার উস্তাদ আমাকে গরু, খাসি দেয়। ম্যাম বললেন— — আমরাও তোমাকে একটা খাসি দেব, তবুও ওকে ছেড়ে দাও। — একটা খাসি! (হেসে বলল) ওই দিয়ে তো আমার দাঁতের ফাঁকও ভরবে না! ভয়ে আমরা আর হাসতে পারিনি। সারা ক্লাস থমকে গেল। ম্যাম বললেন— — তুই যাবি নাকি ওঝা ডাকব? ওর কণ্ঠ গর্জে উঠল— — টিচার বেঁটে খাওয়ালে যেমন স্টুডেন্ট ভালো হয় না, ডাক্তার বেঁটে খাওয়ালে রোগীও সুস্থ হয় না। আমি ওকে নিয়েই যাব। সেই মুহূর্তে আয়শা হঠাৎ অচেতন হয়ে ঘুরতে শুরু করল। আমরা দূরে দাঁড়িয়ে তাকিয়ে রইলাম। কারও কিছু বলার সাহস নেই। খবর দেওয়া হলো তার মাকে। কিছুক্ষণ পর তিনি এসে তাকে নিয়ে গেলেন। কিছুদিন শান্ত থাকার পর আয়শা আবার ক্লাসে এলো। কিছু সময় চুপ থেকে বলল— — তোদের আমি পানিতে ডুবিয়ে মারব। আমরা ভয় পেয়ে একে অপরকে আঁকড়ে ধরলাম। আবার অচেতন হয়ে হাঁটতে শুরু করল। আমরা দূরে দাঁড়িয়ে তাকিয়ে রইলাম। এর কিছুদিন পর এলো নতুন বিপদ—বিজ্ঞান ক্লাস। রিতু হঠাৎ বলল, “ম্যাম, ওয়াশরুমে যাব।” ম্যাম অনুমতি দিলেন। অনেকক্ষণ হয়ে গেল, তবু ফিরল না। গিয়ে দেখি রিতু আকাশের দিকে তাকিয়ে একদম স্থির। ডাকলাম—কোনো সাড়া নেই। প্রিন্সিপাল স্যার এসে দোয়া পড়তে শুরু করলেন। রিতুর শরীর কাঁপতে লাগল। গলা দিয়ে বেরোল অচেনা স্বর— — আমি ওই পাশের কবরস্থানে থাকি। সন্ধ্যায় ও যখন পাশ দিয়ে যাচ্ছিল, ওকে দেখে আমার ভালো লাগে। এখন আমি ওকে আমার সাথে নিয়ে যাব। আমরা চেঁচিয়ে উঠলাম। স্যার বললেন— — কে তুমি? ছেড়ে দাও ওকে। সবাই মিলে ওকে শক্ত করে ধরে রাখলাম। ও অদ্ভুতভাবে তাকিয়ে বলল— — আমাকে ছেড়ে দে, আমি চলে যাব, কিন্তু ওকে নিয়ে যাব। প্রিন্সিপাল স্যার আয়াতুল কুরসি পড়ে ফুঁ দিতে লাগলেন। কিছুক্ষণ পর রিতু শান্ত হলো। এর কিছুদিন পর এক বিকেলে স্কুল শেষে আমরা মাঠে দাঁড়িয়ে প্রাইভেট টিচারের জন্য অপেক্ষা করছিলাম। চারপাশ নিস্তব্ধ। স্কুলের পাশে কবরস্থান। হঠাৎ সাথী চেঁচিয়ে বলল— — দেখ! কবরের পাশে ঘোড়া! আমার দিকে আসছে! আমরা সবাই তাকালাম। কিন্তু কিছুই নেই। আমরা দৌড়ে পালালাম। এইসব ভয়, আতঙ্ক, রহস্যময় ঘটনার মাঝেও আমরা কেউ কাউকে ছেড়ে যাইনি। আমরা সবসময় একে অপরকে আঁকড়ে ছিলাম। তখন মনে হতো—এই বন্ধুত্ব চিরকাল থাকবে। কিন্তু জীবন বদলে যায়। এখন আমরা আটজন আট দিকে। কেউ সংসারে ব্যস্ত, কেউ পড়াশোনায়। কারও সঙ্গে কারও দেখা হয় না, খোঁজও নেই। অথচ একসময় আমরা একে অপরের জীবনের নিঃশ্বাসের মতো কাছের ছিলাম। আজ এত বছর পর যখন সেই দিনগুলো মনে পড়ে, আমি বুঝি—ভয়, আতঙ্ক, হাসি, কান্না—সব মিলিয়েই আমাদের শৈশবের উজ্জ্বল আলো। সেই ভয়গুলোর মধ্যেও আমরা একে অপরকে ধরে রেখেছিলাম, সাহস দিয়েছিলাম। আর সেই দিনের স্মৃতি এখন শুধু ছায়া নয়—আমাদের হৃদয়ে এক অমলিন আলো। যা মনে করিয়ে দেয়—একজন বন্ধুর সাহসই কখনো কখনো আমাদের সব ভয় ভেঙে দিতে পারে। সেই আটজন বান্ধবীর দুনিয়া, সেই ভয়ের দিনগুলো—সবই এখন শুধু স্মৃতির ছায়া। কিন্তু মনে হয়, যতদিন বাঁচব, সেই ছায়া আমাদের আলো জ্বালবে, আর মনে করিয়ে দেবে—সত্যিকারের বন্ধুত্ব কখনো হারায় না। --- শিক্ষার্থী: স্নাতক সম্মান, ৩য় বর্ষ, বাংলা বিভাগ, সরকারি এডওয়ার্ড কলেজ, পাবনা। --- If you want, I can also **make this more literary, suspenseful, or story-like** while keeping your original emotion intact.
রুপপুর পারমানবিক চূল্লী , প্রফেসর মোঃ লুৎফর রহমান
The Sailor of the Seven Seas , translated by Noor-E-Alam
যে চিঠি দেবো বলে অপেক্ষায়, আতিক শাহরিয়ার
**Department of Political Science**, Professor Md. Abdul Hamid