
একটি গান, একজন স্বৈরাচার পতনের হাতিয়ার

তারেক মাহমুদ শৈশবের কথা মনে পড়ে। বইয়ের পাতায় মুক্তিযুদ্ধের গল্প, কিংবা কোনো প্রবীণের কণ্ঠে শোনা সেই দিনগুলোর বর্ণনা আমাকে অদ্ভুত এক স্বপ্নে ভরিয়ে দিত। আমি ভাবতাম—যদি সেই সময়ে থাকতাম! তবে নিশ্চয়ই লড়াইয়ে নামতাম, রাইফেল হাতে না হয় অন্তত পতাকা হাতে। অন্ধকারে মশাল হয়ে দাঁড়াতাম। কিন্তু আমি জন্মেছি অনেক পরে, স্বাধীন দেশের আকাশের নিচে। মনে হতো, আমার সে স্বপ্ন কেবলই কল্পনা হয়ে থাকবে। ২০২৪ সালের জুলাই সেই ধারণা ভেঙে দিল। সারা দেশে দাউদাউ করে জ্বলে উঠল আন্দোলন—কোটা সংস্কারের দাবি। শহর থেকে গ্রাম, ক্যাম্পাস থেকে অলিতে-গলিতে প্রজন্মের কণ্ঠ এক হয়ে উঠল। আমি ফেসবুকের নিউজফিড স্ক্রল করতে করতে দেখছিলাম প্রতিদিনের ঘটনাপ্রবাহ। মুখে মুখে ঘুরে বেড়াচ্ছিল একটি প্রশ্ন—ন্যায্যতার জায়গায় দাঁড়িয়ে কেন এই অবিচার? কেন মেধার মূল্য নেই? আমার ভেতরে তখন অস্থিরতার ঢেউ। মনে হচ্ছিল, কিছু একটা করতেই হবে। কিন্তু কী? আমি কি রাস্তায় যাব? মিছিলে হাঁটব? নাকি অন্য কোনো উপায়ে কণ্ঠ মেলাব? অবশেষে মনে পড়ল একটি গান— “মোরা একটি ফুলকে বাঁচাবো বলে যুদ্ধ করি।” মুক্তিযুদ্ধের সময় লেখা সেই গান আমাকে দিশা দিল। মনে হলো—গানই হবে আমার অস্ত্র, আমার আন্দোলনের হাতিয়ার। কলম হাতে বসে পড়লাম। কাগজের ওপর প্রথম দুটি লাইন ঝরে পড়ল— “বন্ধ থাকুক পড়াশোনা, অন্ধ থাকুক জাতি, আগামীতে দেশ গড়বে সব মুক্তিযোদ্ধার নাতি।” লিখেই মনে হলো বুক হালকা হয়ে গেল। কিন্তু তারপরই শব্দ থেমে গেল। যেন কণ্ঠরোধ হয়ে গেল কলমেরও। একের পর এক দিন কেটে গেল—১১, ১২, ১৩ জুলাই—আমি গান শেষ করতে পারলাম না। কাগজের ওপর ফাঁকা জায়গা যেন আমার ব্যর্থতার সাক্ষ্য হয়ে দাঁড়াল। ১৪ জুলাই আচমকাই এক শব্দে ভেঙে গেল সেই স্থবিরতা। ক্ষমতার মুখ থেকে বেরোল বিষের মতো শব্দ—“রাজাকারের বাচ্চা।” শব্দটি কেবল একটি উক্তি ছিল না, ছিল এক তীব্র অপমান। মনে হলো আমার বুকের ভেতর বজ্রাঘাত হলো। যেন সেই শব্দ আমার ভেতরের প্রতিটি শিরায় শিরায় ছড়িয়ে পড়ল। দেশের প্রতিটি কোণ থেকে স্লোগান উঠল— “তুমি কে? আমি কে? রাজাকার! রাজাকার!” আমি ফেলে রাখা গানের সঙ্গে এই লাইন জুড়ে দিলাম। আর তখনই কলম যেন মুক্ত হয়ে দৌড়াতে লাগল। শব্দ আসতে লাগল ঝড়ের মতো। রাত জেগে আমি শেষ করলাম আমার গান। তবে গান প্রকাশ করার সাহস পেলাম না। পরিবারের মুখ মনে পড়ল। মায়ের কান্না, ভয়ের চিন্তিত মুখ, প্রিয়জনদের নিরাপত্তা—সবকিছু যেন আমাকে আটকে রাখল। ভেবেছিলাম গানটা কেবলই ড্রয়ারে পড়ে থাকবে। কিন্তু ১৬ জুলাই এসে সব পাল্টে দিল। সেদিন নির্মমভাবে হত্যা করা হলো আবু সাঈদকে। তাঁর মৃত্যুর ভিডিও যখন চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল, তখন তা দেখে আমার শরীর কেঁপে উঠল। মনে হলো, তাঁর মৃত্যু যেন আমাকে কানে কানে জিজ্ঞেস করছে—“এরপরও তুমি চুপ করে থাকবে?” আমি বুঝলাম, আমার জীবন তাঁর চেয়েও বড় নয়। যদি তিনি নিজের রক্ত দিয়ে পথ দেখাতে পারেন, তবে আমি কি আমার কণ্ঠ লুকিয়ে রাখব? সেই রাতেই আমি গান রেকর্ড করা শুরু করলাম। অবিরাম পরিশ্রমের পর ১৭ জুলাই রাত দশটায় গানটি ছেড়ে দিলাম ইউটিউব, ফেসবুক, টিকটক—যেখানে সম্ভব। যেন আগুনের মতো ছড়িয়ে পড়ল গানটি। মানুষের মুখে মুখে আমার লেখা গাওয়া হতে লাগল, শেয়ার হতে লাগল নিরন্তর। কিন্তু গান ছড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে ছড়িয়ে পড়ল হুমকি। ফোনে, ইনবক্সে বারবার সতর্কবার্তা—“গানটা ডিলিট করো, না হলে বিপদ হবে।” আমি জানতাম, এই হুমকি কেবল কথার নয়। ১৮ জুলাই থেকে আমাকে বাড়ি ছাড়তে হলো। একদিন এক বন্ধুর ঘরে, পরের দিন এক আত্মীয়ের বাসায়। কিন্তু কেউই বেশিদিন আশ্রয় দিতে পারল না। তাদের ভেতর ভয় কাজ করত, আর আমি বারবার ছুটে যেতাম নতুন আশ্রয়ের খোঁজে। প্রতিটি রাত আমার কাছে হয়ে উঠত নতুন অনিশ্চয়তার যাত্রা। আমার পরিবার কেঁদে বলত— “বাবা, গানটা ডিলিট করে দে। আমরা তোকে শুধু সামনে থেকে দেখতে চাই।” তাদের চোখের জল বুকের ভেতর ছুরি চালালেও আমি গান ডিলিট করিনি। আমি জানতাম, যদি একজন জুলাইয়ের যোদ্ধাও আমার গান শুনে অনুপ্রাণিত হয়, তবে এই গান মুছে ফেলার নয়। দিনের পর দিন কাটতে লাগল পালিয়ে। বুকের ভেতর ভয়, তবু তার চেয়েও বড় ছিল দৃঢ়তা। অবশেষে এল ৪ আগস্ট। দেশজুড়ে উচ্চারিত হলো এক দফার ডাক—স্বৈরাচার পতনের ডাক। আমি বুঝলাম, আর পালিয়ে থাকার সময় নয়। এবার সরাসরি মাঠে নামতে হবে। আমি মানুষের স্রোতে মিশে গেলাম। রাস্তায় রাস্তায় গর্জে উঠল স্লোগান, হাতে হাতে উঠল পতাকা। বাতাসে ভেসে বেড়াতে লাগল প্রতিবাদের অগ্নিশিখা। ৫ আগস্ট, পদ্মার চর এলাকায় আশ্রয়ে থাকা অবস্থায় হঠাৎ ফোন এলো মায়ের। কণ্ঠ কাঁপছিল তাঁর, তবুও ভেতরে বাজছিল আনন্দের ঢেউ— “বাবা, তুই বাড়ি ফিরে আসতে পারিস। দুষ্টের বিচার আল্লাহ করেছেন।” মুহূর্তেই বুঝলাম, স্বৈরশক্তির পতন ঘটেছে। আমি ছুটে গেলাম বাড়ি। মায়ের কোলে মাথা রেখে অশ্রুতে ভিজে উঠল গাল। তারপর বাইক নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম শহরের রাস্তায়। সেই দৃশ্য আমি কোনোদিন ভুলতে পারব না— রাস্তায় দু’পাশে মানুষের ঢল, হাতে পতাকা, চোখে অশ্রু আর হাসি। বিজয়ের মিছিল যেন ঢেকে দিল আকাশ-বাতাস। শিশুরা দৌড়ে বেড়াচ্ছে, যুবকেরা স্লোগান দিচ্ছে, বৃদ্ধরাও চোখ মুছে হাসছেন। হঠাৎ দেখলাম এক ছোট ছেলে, হাতে লাল-সবুজ পতাকা বিক্রি করছে। আমি দাঁড়িয়ে তার দিকে তাকিয়ে রইলাম। চোখের কোণে জল জমে উঠল। মনে হলো, আমার শৈশবের স্বপ্ন পূর্ণ হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের কাহিনিতে যে লড়াই কল্পনায় দেখতাম, সেই লড়াই আমি সত্যিই করেছি। হয়তো হাতে রাইফেল ছিল না, কিন্তু কলম ছিল, কণ্ঠ ছিল, আর কণ্ঠে ছিল গান। এটাই আমার যুদ্ধ। বর্তমানে ইউটিউবে আমার এই গানটির ভিউ প্রায় ৭ মিলিয়ন, টিকটকে প্রায় ১০ মিলিয়ন এবং ফেসবুকে প্রায় ৫ মিলিয়ন। --- **গানের অংশ:** বন্ধ থাকুক পড়াশোনা, অন্ধ থাকুক জাতি আগামীতে দেশ গড়বে সব মুক্তিযোদ্ধার নাতি অন্ধ থাকুক পড়াশোনা, অন্ধ থাকুক জাতি আগামীতে দেশ চালাবে সব মুক্তিযোদ্ধার নাতি তুমি কে আমি কে রাজাকার, রাজাকার চেয়েছিলাম অধিকার হয়ে গেলাম রাজাকার তুমি কে আমি কে রাজাকার, রাজাকার চেয়েছিলাম অধিকার হয়ে গেলাম রাজাকার মানুষ হয়ে মানুষ পেটাও সামান্য বুক কাঁপে না! অধিকার চেয়ে বাঁচবে যারা তারাই কি খুব অচেনা? মানুষ হয়ে মানুষ পেটাও সামান্য বুক কাঁপে না! অধিকার চেয়ে বাঁচবে যারা তারাই কি খুব অচেনা! দলের চেয়ে দেশটা বড়, তার চেয়ে বড় মানুষ এত অন্ধ হলাম কবে, ফিরবে কবে হুঁশ একটু খানি জড়িয়ে ভাবুন, দোহাই একটু আয় মরণ ভাইয়ের গায়ে বোনের গায়ে করতে আঘাত ভাবুন মানুষ হয়ে লাভ কি হলো, দেশের এ কী হাল হলো রক্তাক্ত ভাই-বোনেরা চায় সংস্কার
রুপপুর পারমানবিক চূল্লী , প্রফেসর মোঃ লুৎফর রহমান
The Sailor of the Seven Seas , translated by Noor-E-Alam
**Department of Political Science**, Professor Md. Abdul Hamid
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, মোঃ রাকিবুল ইসলাম রাকিব
কাঠের বাক্সো ,মোঃ নাজমুল হক , এস. এম. ফরিদ , সহযোগী অধ্যাপক, রসায়ন