নির্বাচিত কবিতা সংকলন ২ **জুলাইয়ের স্বপ্নের হিসাব** বেলাল শেখ জুলাব রাতের আগুনে আমরা দেখেছিলাম স্বপ্ন, যেখানে ন্যায়ের সূর্য উঠবে। প্রতিটি কণ্ঠে ধ্বনিত হবে স্বাধীনতার সুর। রক্তে ভেজা রাস্তায় আমরা লিখেছিলাম প্রতিজ্ঞা— যেখানে শৃঙ্খলের শিকল ভাঙবে। অন্যায় জুলুম পুড়ে ছাই হবে জুলাইয়ের দ্রোহে। কিন্তু আজ প্রশ্ন জাগে— সে স্বপ্ন আজ কতটুকু পথ পেরিয়েছে? নাকি কেবল মুখোশ বদলে দাঁড়িয়ে আছে, তাদের অবস্থানেই আরেক? কতটা সত্য হলো শহীদের রক্তের দাবি? কতটা ন্যায় পেল অপেক্ষারত শহীদ মায়ের চোখ? তবুও অর্ধ আলোতে অন্ধকার ভাঙে! জুলাই আমাদের শিখিয়েছে— বাঁচতে হলে সকলকেই ঐক্যবদ্ধ থাকতে হয়। স্বপ্ন শুধু জাগতে নয়— বাস্তবে রূপান্তর করতে হলে, প্রতিদিন দাঁড়াতে হয়, প্রতিদিন প্রশ্ন করতে হয়। শিক্ষার্থী, অনার্স প্রথম বর্ষ, ইতিহাস বিভাগ, সরকারি এডওয়ার্ড কলেজ, পাবনা। **১৭-ই জুলাই** বায়েজিদ হাসান নিলয় আমি জুলাইয়ের অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়েছি। দেশের তোষামোদ করা নেতাদের মতো রূপ ধারণ করিনি। এই দেশে বৈধতার গায়ে গা লাগিয়ে আড়াল করে রাখা হয়েছে অবৈধ জন্ম দাগ, যা প্রতিটি শিশুকে শেখায়— হও তোষামোদকারী, হও ক্ষমতা লোভী আর শান্তির সমাপ্তি ঘটানোর ঘটক। আমরা দিবস ছাড়া দেশকে ভালোবাসি না, সেই দিবসে থাকে একদল ক্ষুধার্ত কুকুরের ঝাঁক। ওত পেতে থাকে দেশপ্রেমী মুখোশধারী বাবা, তার শিশুর ক্ষুধা মেটাতে। আমি চাই না তেমন বাবা, আমি চাই না তেমন শিশু যে ক্ষুধা মেটানোর আশায় তাকিয়ে থাকে মুখোশধারী দেশপ্রেমী বাবার দিকে। এই শিশুকে তোমরা কেন বলো আগামীর ভবিষ্যৎ? কেন তোমরা বলো এই শিশু দেশ চালাবে, এই শিশু দেশ গড়বে? যার পাকস্থলীতেই জমে আছে দেশ গিলে খাওয়ার লোভ। এমন শিশু তোমরা জন্ম দিও না, গলা টিপে হত্যা করো তাকে— পারবে? পারবে কেউ এমন শিশুকে হত্যা করতে? পারবে কেউ তার পিতার মুখোশ টেনে ছিঁড়ে ফেলতে? পারবে না! কারণ তোমরাও সুবিধাবাদী। তোমরা এমনভাবে তোমাদের অবস্থান প্রতিষ্ঠা দিতে চাও যা দেশের বুকে লাখ মৃত্যুর সমান। তোমরা চাও ভোগ করতে। কিন্তু মনে রেখো— তোমাদের অবস্থান প্রতিষ্ঠা দিতে গিয়ে প্রভুর দরজায় তোমরা অবস্থান হারাবে। আর সেই শিশু— সেই শিশু বড় হয়ে উঠবে তোমাদের অবস্থানকে ধ্বংস করতে। সে তোমাদের রক্ত খাবে মদের গ্লাসে গ্লাসে, রক্তের গন্ধ হবে কুকুরের, যা কোনো কুকুর অন্য কুকুরের রক্তের গন্ধের সাথে মিলাতে পারবে না। আহ! কারণ, তোমরা কুকুরের থেকেও হিংস্র এবং জঘন্য। সেই শিশু তোমাদের রক্ত খাবে আর ঢেঁকুর তুলে বলবে— আহ, এ যেন অমৃত! সাবধান! তোমরা এমন শিশু জন্ম দিও না, তোমরা মিলন বন্ধ করো, আজ থেকেই শপথ নাও— তোমরা আর কোনো শিশু জন্ম দেবে না। তোমরা শপথ নাও— তোমরা আর ক্ষুধার্ত শিশুকে দেশের শান্তি গিলে খাওয়াবে না। যদি পারো দেশের দুঃখ তুলে দাও তার মুখে, তুলে দাও তার মুখে সালাম, রফিক, বরকতের জীবনের চিহ্ন। দেখবে তারা তৃপ্তি পাবে, তাদের ঢেঁকুর থেকে ভেসে আসবে কৃতজ্ঞতার ঘ্রাণ। তারা বেঁচে যাবে, তোমরা মহান হবে। তোমরা থামাও, তোমরা থামাও এবার এই শান্তি সমাপ্তির মিছিল। গর্জে ওঠো দেশের দুঃখ গিলে খাওয়ার জন্য, প্রতিটি ঢেঁকুরে শান্তির ঢল বাজাও, সুগন্ধ ছড়াও বাতাসে। তোমরা থামো, তোমরা লাগাম দাও এবার শান্তি সমাপ্তির মিছিল। শিক্ষার্থী, অনার্স প্রথম বর্ষ, মার্কেটিং বিভাগ, সরকারি এডওয়ার্ড কলেজ, পাবনা। **বুদ্ধিজীবী** মোঃ সাগর আলী ঘুম যখন ছুঁয়েছে আঁখিতে, আঁখিতে, মুয়াজ্জিনের আজান ও পাখির কিচিরমিচির হওয়ার কিছু আগ মুহূর্তে— হায়েনার নখরে ঝরে গেছে এক হাজার সত্তর উজ্জ্বল নক্ষত্রের প্রাণ। চারিদিকে নিস্তব্ধ, অন্ধকার, চিৎকার, নিরাশা আর হাহাকার। নখরের আঘাতে ঝরে গেছে জ্ঞানী, গুণী মানুষের প্রাণ। হায়েনারা চেয়েছিল বাংলাকে অন্ধকারে পরিণত করতে, তাইতো বিস্তার করেছিল ভয়ংকর বুদ্ধির জাল। বাংলার মানুষের নয়নে ছিল অশ্রু, ছিল প্রতিশোধের তীব্র হিংসা। গর্জে ওঠে বাংলার মানুষ, বাংলাকে মুক্তির দিশা দিতে। ভুলেনি বাংলার মানুষ আজও ১৪ ডিসেম্বরের ইতিহাস, তাই দীপ্ত কণ্ঠে আওয়াজ তোলে— গাই শহীদ বুদ্ধিজীবীর গান। শিক্ষার্থী, অনার্স প্রথম বর্ষ, ইতিহাস বিভাগ, সরকারি এডওয়ার্ড কলেজ, পাবনা। **ইচ্ছে করে** তানজির রহমান প্রত্যয় আমার বড় ইচ্ছে করে লিখতে কাব্য ছড়া, আব্বু বলেন সকাল থেকে হয়নি কেন পড়া? ছড়া লেখার জন্য যখন কলম নিলাম হাতে, আম্মু এসে দিলেন ধমক— পড়তে হবে রাতে। পড়তে আমার মন বসে না, মন চলে যায় দূরে, ইচ্ছে করে কল্প মেলাই পাখি-পাখিদের সুরে। লেখক: পরিচয় নেই **জুলাই: রক্তে লেখা গণ জাগরণ** মোঃ মাহিম পাঠান আমি ছিলাম এক স্বপ্নবাজ, বইয়ের পাতায় আশার আঁচ, মেধার রাজ্যে সিংহাসন চাই, চাই না ভাগের কাঁচা মাছ। তাই দাঁড়ালাম ব্যানার হাতে, স্লোগানে ভরালাম আকাশপাতে। কিন্তু তারা ভয় পায় আমার কলম, তাদের রাইফেল কথা বলে থমথম। লাঠি এলো, গুলি এলো, বন্ধুর কণ্ঠ নিথর হলো, সময়টা থেমে গেল। মা বলেছিল, “বাড়ি ফিরিস না দেরি করে”, আমি ফিরিনি, আমি আছি ইতিহাসের ভোরে ঘুমাই, লাল রক্তের চাদর পরে। বন্ধুদের চোখে আজ আগুন, তারা জানে, আমার রক্ত বৃথা যাবে না। জুলাই শুধু মাস নয় আর, এটা এক যুদ্ধের নাম, এক সূর্য ওঠার আশা। আমার নামে গড়ে উঠুক ঘর, যেখানে সময় থামে না, স্বপ্নও নয় মরে। আমার মৃত্যু যেন কারো অধিকার হয়, আমার লাশ যেন কারো প্রশ্ন জাগায়... লেখক পরিচিতি নেই **মা আমার মাটি** মোঃ রাজিবুল হক মা আমার মাটি— স্নেহের বন্ধনহীন ঢেউ, তাঁর কোলে শুয়ে শুনেছি গল্প, স্বপ্ন বুনেছি ঢেউ-ঢেউ। তারই বুকে খেলেছি খেলা, কেটেছে শৈশবকাল, মাটির গন্ধে মিশে আছে মায়ের মমতার জাল। মা আমার মাটি— নরম তার বুক, তারই দুঃখে গড়ে উঠেছে জীবনের সব সুখ। রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে নিজে, সন্তানদের রাখেন তিনি আড়াল করে। ক্ষুধার্ত মুখে দেন শেষ কণাটুকু ভাত, নিজে থাকেন উপবাসে, করেন না কোনো আভাস। মায়ের চোখে ঝরে যে অশ্রু বিন্দু, সেই জলেই জন্মায় ফসল— জীবন-মরণের বন্ধু। মা আমার মাটি— ত্যাগের অপর নাম, যে মাটিতে বুনি আশা, ফোটে ভালোবাসার দাম। এই মাটিতেই শুয়ে আছে কত শত বীর, যাদের রক্তে রাঙা হয়েছে প্রান্তর আর নীর। মা আমার মাটি— একেই তো বলি, তার ভালোবাসায় পাই জীবনের রং তুলি। যে মাটি দেয় দান, যে মা দেয় প্রাণ, দু’জনেই আমার আশ্রয়, আমার জ্ঞানের স্থান। মা আমার মাটি, কোমল আর ধৈর্যভরা, তাঁর কোলে পাই শান্তি, আশ্রয় সোনাঝরা। ঝড়ে যখন দুলে যায় জীবনের গাছ, মায়ের ছায়ায় থেমে যায় সব কাঁপন, সব আঘাত। মা আমার মাটি, মা আমার প্রাণ, তাঁর কোলে গাই আমি শান্তির গান। জীবন ফুরোলেও এই হৃদয় বলে— মা, তুই আছিস মাটির ঘরে, আর আছিস “মা” তুই আমারই অন্তরে। **রক্ত** লাখো শহীদের রক্তে রাঙানো, একুশে ফেব্রুয়ারি। হাজারো ছাত্রের গুলির বিনিময়ে, ভাঙলো সব জড়জড়ি। রফিক, বরকত, শফিক, জব্বার, আনলো রাষ্ট্রভাষা। আবু সাঈদ মীর মুগ্ধও সেই আনলো সত্য কথা। পানি লাগবে, পানি কথাটিতে আজ, রয়েছে শুধু স্মৃতি। অন্যায়ের বিরুদ্ধে বুক পেতে, ছাত্রদের নেই ত্রুটি। স্বাধীনতা স্বাধীনচেতা আছে অনেক তফাৎ, ন্যায়ের কাছে অন্যায় হবেই কুপোকাত। একাত্তরের গণঅভ্যুত্থান, চব্বিশের জুলাই— রক্তের প্রতিশোধ নিতেই হবে, চলো বাংলার গান গাই। যদি-মনু সবাই সমান, যেই আসুক না কেন, হীনরা হীনই থাকবে, ধনীরা হবে ধনবান। পরিচিতি নেই **চেষ্টা** রায়হানুর রহমান চেষ্টা যায় না কখনো বৃথা, তাই চেষ্টা ব্যর্থ করো না, সময় নষ্ট হেথা। আয়েশ গদি বৈঠক হেতু বাড়ে না কোনো মান, ভাবুক বাবুর কপাল কুঁচিতে পূরণ হয় না স্বপ্ন। এধারের আশা ওধারের নয়, করিতে হবে ভোরের আগে, মহামানবের অনুরূপ যদি চাও হতে। সেবার দ্বার খুলে দাও মানব মাঝে, মাঠে-ময়দানে তবে নামো আগে। না করো আপন বড়াই, বলিও না নিজেকে বড়, করো না নিজেকে ছোট। সৎকর্ম সর্বময়, মৃত্যু হবে শান্তিময়। শিক্ষার্থী, এমএ, হিসাববিজ্ঞান বিভাগ, সরকারি এডওয়ার্ড কলেজ, পাবনা। **কর্ণধার** মোছাঃ সাদিয়া পারভীন প্রভাত বেলা উঠিয়া আমি বাহির পানে চাই, কুয়াশার চাদর দিয়ে প্রকৃতিরে রাখিছে ঘিরায়। শীত আমায় করছে কাবু, থাকিতে কয় উষ্ণতায়, আমারে কি আর এমন কইরা থাকিলে মানায়? ফুটাইতে হইবো মুখে হাসি, মিটাইতে হইবো ক্ষুধা, আমার দিকে চাহিয়া আছে আমার অস্তিত্বটা। শিশিরেতে পা ভিজাইয়া আইলাম নদীর তীরে, তীরে আইসা তরী আমারে নিলো তাহার তরে। বাইছি আমি ছোট্ট তরী, নদীর বুক চিরে, স্তব্ধ নদীর শান্ত জলে নীরব কথোপকথনে। এখান নদী, এখান জল, এখান আমার নাও, ক্ষণে ক্ষণেই শীতল হাওয়া আমায় দোলাইয়া যায়। একলা হইয়া বাইয়া যাইতেছি জীবনের ধারা, চলিতে চলিতে হইয়া যাই ভাবনার জগতে দিশেহারা। কুয়াশা ভেদে সূর্য আইলো, নদী দিলো মাছ, একটু দেরি হইলেই থাকিতে হইতো উপবাস! লেখক পরিচিতি নেই **চিরন্তন** মুহাম্মদ বদরুল আলম মানবতার মুক্তি খোঁজে আর্তচিৎকার করে নীরবতাকে ঘিরে, রক্তপিপাসু শত্রুরা রাজত্ব জিতে দেয় অন্তঃপ্রাণদের ভিড়ে। স্বাধীনতার মৃত্যু হয় ধূর্ত রক্ষকের হাতে, মরীচিকার মোহে বিভোর নাগরিক ফিরে যায় আঁধারের পথে। গোলায় বারুদের চেয়ে কাঁটার দাপটই বেশি, বিবেকের মুখে কুলুপ এঁটে পশুর মুখে আঁকে হাসি। শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণে কতক মানুষ স্বেচ্ছায় কর্মে অবিচল, একই মানুষ অন্ধের মতো নিগৃহীত আদর্শে বিলাসী। অগ্রগতির কলমই মুক্তির লিপ্ত অস্ত্র, জাতি হিসেবে শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণে এই উৎকৃষ্ট শাস্ত্র। সুবিবেচকের উক্তিকে উড়িয়ে দিতে হবে বাস্তবতার আকাশে, সমাজব্যবস্থার বাধাহীন হতে হবে মত প্রকাশে। ক্ষমতার লোভে অস্তিত্ব বিসর্জন দিতে ভাবে না একটি বার, সত্যের বিপরীতে অভিনয় করে নিজেকে প্রমাণ করতে চায় বারবার। শুদ্ধ মানবিকতার ভালোবাসার রাঙিয়ে তুলতে হবে মানবতার ধরনীকে, প্রজন্ম যেন বাঁচার অস্তিত্ব খুঁজে পায় ইতিহাসের লেখনীতে। শিক্ষার্থী, অনার্স প্রথম বর্ষ, গণিত বিভাগ, সরকারি এডওয়ার্ড কলেজ, পাবনা। **স্বপ্নহীন** ড. মোঃ শফিকুল ইসলাম মানুষের জন্ম-জন্মান্তরের বন্ধন যুগ যুগ ধরে শিকড়কে করে আপন, তবু অস্বীকার করে চকচকে সভ্যতার রক্তে মিশে ভুলেছে আপন ভুবন। অবাক! আজ এক আধুনিকতায় সে বন্ধন ছিন্ন হতে হতে দাঁড়িয়ে আছে আরেক আধুনিকতায়! দেশ হতে দেশহীন, গ্রাম হতে গ্রামহীন, রক্ত হতে রক্তের সম্পর্কহীন, শিকড় হতে শিকড়হীন— হওয়াই যেন মানুষের এই এক আধুনিকতার নামে হীন প্রতিযোগিতার আধুনিকতা! উৎসব পার্বণ ধর্মীয় রাষ্ট্রীয় সামাজিক বন্ধন কিংবা শিকড়ের আয়োজন আজ আর মানুষকে টানে না, টানে না শিকড়ের আকর্ষণ। যে মাটি-মানুষ-প্রকৃতি রক্তে— তোমার বেড়ে ওঠার শক্তি জুগিয়েছে, সে মাটির আয়োজন তোমার নীরবতায়— তুমি ছিন্ন করে ছুটে চলো কোনো এক অজানার পানে— ধিক্ ধিক্ সে সব স্বপ্নহীন, শিকড়বিমুখ সম্পর্কহীন আধুনিকতার পোশাকীদের। সহযোগী অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, সরকারি এডওয়ার্ড কলেজ, পাবনা। **মা** মা, ও মা, মা— তুই শুধু আমারই মা। কত অবহেলা, অযত্ন, অপমানের ব্যথা— সহ্য করার ক্ষমতা কেবল তোরই আছে রে মা। জানিস রে মা, তোর পাগলি মেয়েটা তোরে অনেক ভালোবাসে, তোর অসুখের কথা ভেবে সারারাত অশ্রু ঝরায়। তুই হয়তো শহরের ঐ ম্যাম সাহেবের মতো গড়গড় করে ইংরেজি বলতে পারিস না মা, তাও তুই—মা, আমার চোখে সবচেয়ে প্রিয় আপন। তোর সাথে মা, তুলনা হয় না কারো। কত শীতের রাত পার করে দিলি মা, তুই কত কষ্ট করে, তবুও তুই মা একটুও কোলে থেকে নামালি না— আমার কষ্ট হবে বলে। উনুনে যখন ভাত চাপিয়েছিলি মা, দেখেছি তোর নয়ন ভরে, ছেঁড়া-ফাটা শীতের পোশাকে মলিন মুখখানি— কত কথা না বলে। জানি রে মা, তোর দুঃখের কত শত কথা, কত অপমান সহ্য করলি মা সন্তানের মুখ চেয়ে। গরিবের মেয়ে বলে কত অপমান সহ্য করলি মা— তুই বিনা বাক্যে ক্ষয়ে। কত আঘাতই মা, যে তুই হাসিমুখে উপেক্ষা করলি অসম্মানের ভয়, বিধাতা যেন মা, সেই সব মুখোশের বিচার একদিন করে। সেই দিন তুই মা দেখবি চেয়ে— স্রষ্টার বিচারে ভদ্রবেশী শয়তানেরা কী করে! মাঝে মাঝে মা, চেয়ে দেখি তোর চোখ দুটির পানে, কপোল বেয়ে জল পড়তে থাকে আমার ক্ষণে ক্ষণে। মা, কেন হলাম বড়? ধীরে ধীরে বৃদ্ধ হচ্ছিস যে মা আরো! ভয় লাগে মা, যাবি না আমায় ছেড়ে, তুই ছাড়া মা থাকব কেমন করে? ও বিধাতা, সব কেড়ে নাও আমার থেকে, তবুও তুমি মাকে রেখে দাও আমার পাশে। আমার আয়ু খানিকটা যোগ হোক মায়ের তরে, তবুও মা আমায় সারাটা জীবন ভালোবাসায় যাক অতি আদর-স্নেহে। মায়ের মতো কেউ হয় না আপন, মা থাকবে না ভাবতেই হৃদয়ে আমার যন্ত্রণা ধরে— যখন তখন। **দেয়ালের ওপাশে কে** —দেয়ালের ওপাশে কে? —মৃত্যু যে ঘনিয়ে এসেছে। —এত শীঘ্রই বুঝি এলে? —অতি দীর্ঘই ছিল সময়। —এইতো ঘুমটা ভাঙলো, —বেলা যে ফুরিয়ে এলো। —আরেকটু না হয় বসো? —জগৎ যে অপেক্ষারত। —মৃত্যু, তুমি এত পাষাণ? —পবিত্রতায় আমি আশান্বিত। —মৃত্যু, তুমি ভয়ের সাগর? —আমার দ্বারাই আমি নির্ভয়। —অতঃপর বুঝি নেবে প্রাণ? —মৃত্যু যে ভাই, যথার্থ চিরন্তন। —এবার তবে মুক্তি দাও, —পূর্ণ নিয়ে প্রস্তুত হও। —সবকিছু হয়েছে শুদ্ধ, —এবার হবে মৃত্যু বিশুদ্ধ। —ভয়ে যে শরীরে কম্পন ধরেছে, —মৃত্যু যে ঘনিয়ে এসেছে। **প্রফুল্ল শৈশব** —স্নিগ্ধতায় পরিপূর্ণ সেইসব দিন কোথায় গেল হারিয়ে? —দুঃখের বেলা ধ্বংস করে শৈশব নিয়ে আসি কুড়িয়ে। —যেখানে থাকবে না কোনো চিন্তিত কপালের ভাঁজ, —আকাশ জুড়ে রাঙিয়ে দেবে রংধনুর সাত রঙের সাজ। —সবুজ পাতা ছড়িয়ে যাবে দিগন্তের পর দিগন্ত জুড়ে, —ছেলের দল সাঁতার কেটে পার হবে সেই পুকুরপাড়ের তীরে। —মেয়েরা সব দল বেঁধে নতুন রঙে সাজে, —শৈশবের ঐ মিষ্টি-মিঠাই কত না মজা লাগে। —বসন্ত ফুলে ছড়াবে সুবাসিত ঘ্রাণ, —কোকিলের দল নতুন প্রাণে গেয়ে যাবে গান। —হঠাৎ যেমন আকাশ ফেটে নামে বাদলের ধারা ঝুপঝুপ, —তেমনি করেই ফিরে আসুক আমার প্রফুল্ল শৈশব। **বসন্ত বিলাস** বসন্ত হলো ঋতুর রাজা, রমণীরা সব দল বেঁধে সাজা। ফাল্গুনী আর চৈত্রের ছোঁয়ায়, সন্তোষ জড়িয়ে শীত চলে যায়। বসন্তের আগমনে ফুলের সুবাস, চারিদিকে যেন ঘ্রাণের বাতাস। শীতের আবেশে পাতা ঝরে যায়, বসন্ত ঋতুতে বৃক্ষ প্রাণ ফিরে পায়। বসন্তের আগমনে মৌমাছি মধু খোঁজে, ফুলের ঘ্রাণে প্রজাপতি নেচে ওঠে। বসন্তের আগমনে কোকিলের সুমিষ্ট গান, প্রকৃতি ফিরে পায় চিরসবুজ প্রাণ। **এসেছে ফাল্গুন** মোছাঃ মিতা খাতুন সেই দিনের কথা মনে পড়ে কি? যেদিন আলো বন্ধ করে দিয়েছিল জোনাকি। মাসটি ছিল ফাল্গুন, জ্বলছিল বাংলার বুকে আগুন। মাতৃভাষা বাংলার দাবি নিয়ে, মিছিল বের হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। সবার মুখে একটাই বাণী— “রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই” তাই জানি। কিন্তু সে দাবি হয় না মানা, শুধু দেওয়া হয় যন্ত্রণা। ফাল্গুনে যেমন ফোটে পলাশ, তেমনি ঝরছিল বাংলার বুকে লাশ। রফিক, শফিক, বরকত ও নাম না জানা, তরুণের রক্তে আঁকা হয়েছিল আলপনা। আবার এসেছে ফাল্গুন, তাই মনের মাঝে করে গুনগুন— “আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি আমি কি ভুলিতে পারি।” শিক্ষার্থী: একাদশ মানবিক, সরকারি এডওয়ার্ড কলেজ, পাবনা। **নিস্তব্ধ নিশীথের স্বপ্ন** মোঃ রাজু আহমেদ নিস্তব্ধ নিশীথে জ্যোৎস্নার আলোয় হেলান দিয়ে আকাশের তারা ছুঁতে দেখি, এ যেন তারা ছোঁয়া নয়, এ যেন প্রেমিকের বেদনার ঘোষণা। হাওয়ার সুরে গোপন কথা মন বলে যায়, শুধু সে শোনে না। নিশীথের চাঁদের ভাঙা আলো জ্যোৎস্না ঝরানো বাতাসের সুরে লুকানো কলরব, শূন্যতার মাঝে বাজে মৃদু গান। এ যেন স্মৃতির পাতায় লেখা অমর কবিতা, হৃদয় শোনে, ছায়া ভেসে আসে তার— সে সরলতার কোলে লুকানো নীরবতা। নিস্তব্ধতার ভেতর বাজে একটি সুর যা শুধু হৃদয় শোনে আর কেউ শোনে না। স্বপ্ন আসে, স্বপ্ন যায়, তবু রাত শেষ হয় না— যা শুধু হৃদয় বোঝে, আর কেউ বোঝে না। চাঁদের আলোয় ভিজে গেছে পথ, নিশীথের ঘ্রাণে মিশে আছে অমর ভালোবাসা। যে হারিয়েছে তার চোখে ভেসে ওঠে আগুন। হারানো হাত ধরে একা হাঁটি, ভোরের আলো ধীরে ধীরে ভেঙে আনে আশা, নিশীথের স্বপ্ন চিরকাল বাঁচে নীরবতার কোলে, হৃদয়ের গভীরে। স্নাতক (সম্মান) ৪র্থ বর্ষ, বাংলা বিভাগ, সরকারি এডওয়ার্ড কলেজ, পাবনা। অর্থ অন্বেষণ অথবা বিপ্লব আতিক শাহরিয়ার প্রেমিকাহারা প্রেমিক বিচ্ছেদ বেদনা ভুলে যায় বেকারত্বের কষাঘাতে। থেমে থাকা কলম কালির বদলে ক্ষুধার্ত বিষাদ উদ্‌বিরণ করে কফন সাদায়। শিশুর কান্না, মায়ের আহাজারি সব ছাড়িয়ে বিদায় নেয় সব। আমার কান্নিশে বসে যে কাক মৃত্যু সংবাদ দিয়ে যায়, সেও নেয় বিদায়। পথের ভিন্নতায় সাক্ষরহীন বিদ্যা ও বিবেক। তারপর, আমাদের গতিপথ ভিন্ন হতে হতে আমৃত্যু বিচ্ছেদ ঘটেছিল সময়ের। আমরা এক হই, এক হতে হয় যখন আমাদের ক্ষুধার সাথে বসে। শত সহস্র পদধ্বনি এগিয়ে যায় আমাদেরই মাড়িয়ে। বিপ্লব ঘটে যায় আকস্মিক, শিশু থেকে বৃদ্ধ উত্তাল লোহিত উন্মাদ মনোবল। অন্নের বদলে জলপানে ক্ষুধা নিবারণ করে যে শ্রমিক কিংবা পিতা, ক্লান্তির বদলে তার চোখে ক্রোধ। ক্রোধের দাবানল পুড়ে যায় শোষণ, শাসন অথবা স্বৈরাচার। সূর্য যেন উদয় হয় অস্ত যাবে কাল, অস্ত যায় নতুন দিনের আশায়। তবুও তো অন্ধকার নেমে আসে! রাত গভীর হয়। রাতের পেট চিরে বেরিয়ে আসে লোভের হায়েনা, মাকড়সার মতো নিঃশেষ করে নিজ মায়ের উদর। হঠাৎই মনে হয় মহাকালের মহাসড়কে বিপ্লবের নামে প্রহসন চলে কেবল। অন্তর আজও মজুরের জুতো সেলাই করে দু-মুঠো ভাতের আশায়। আমরা মোঃ জাহিদুল হক আমাদের মনে ঝড়ো বৈশাখ বসন্ত পাশাপাশি, আমাদের মনে কোলাহল, প্রেম, আনন্দ-গান-হাসি। সারা রাত জেগে বন্ধুর মেলা বন্ধুর আবদার, আমাদের চোখে জেগেছে স্বপ্ন উদ্দাম অবতার। আমাদের ব্যথা, আমাদের সুখ আমাদের কথা, প্রিয় সব মুখ আমাদের বুকে আমাদের আশা স্বার্থের অবরোধ, দৃষ্টি মেশায় বৃষ্টির নেশা সূর্যের পোড়া রোদ! আয় ছুটে আয় বন্ধু আমার জোছনা-জোয়ার রাত, ঘর ছাড়া মন বড়ই বেয়াড়া গিটারে উঠেছে হাত। আয় দল বেঁধে আয় বন্ধুরা গলায় বাঁধ রে সুর, গানের খেয়ালে প্রাণের মেলায় নিকট হয়েছে দূর। আমাদের মন, আমাদের ছায়া আমাদের প্রেম, বিরহের মায়া আমাদের পথে বার্তাবাহক নতুনের পিরকুট, আমরা অগ্নি আকাশ আলোর দীপ্তি করেছি লুট। বিরহেই ভালো থাকি কাওসার হোসেন তবুও আমরা বিরহেই ভালো থাকি সাথে গিয়ে করি দুঃখ নদীতে স্নান, দুঃখের সাথে এত সখ্যতা আমাদের সুখ রেখে করি দুঃখের আহ্বান। স্বর্গ রেখে নরক খুঁজি সুখ রেখে দুঃখ আকর্ষণ তো সেই বেশি করে যে নারী স্বরূপে কামুক। ভালোবাসা রেখে সুখকে খুঁজি ক্ষণিকের মোহ মায়া শান্তি আর সুখ একই যে নয় এ যেন আমাদের ভীষণ অজানা! যে নারী মরে দিতে পারে স্বরূপে উদ্দাম সুখের স্বাদ সে নারী জীবনে এনে দিতে পারে কি? সুখ-শান্তি একই সাথে? একজনে হয়তো শান্তি সাজায় আরেক জনে সুখ বোকা মন তবে ঠিকই বেছে নেবে ক্ষণিকের আশা সুখ। শান্তি যদিও দীর্ঘস্থায়ী তবু তাতে অবহেলা সুখের জন্য কত সংগ্রাম দিবা নিশি বেলা। ক্ষণিকের সুখ শেষ হয়ে হয় বিরহের অভিযান তবুও যেন এ সুখ কখনো হয় না অম্লান। তবুও আমরা বিরহেই ভালো থাকি যদিও বিরহ হয় না আপন, কিন্তু যে জন বিরহে ভাসালো! সে-তো আপন জন। ছড়া — নৃত্যের মেলা ওরে ও ময়না পাখি, দেখ না, পরে গয়না ভারি। লাগবে তোকে মিষ্টি ভারি। লাল ফিতে বেঁধেছিস? ঝুমুর পরে নেচেছিস? ঠোঁট রাঙিয়ে ঘোমটা পর পায়ে নিয়ে সখীর দল। হস্ত রাঙা চুড়ি দ্বারা, নেত্র রাঙা কাজল লেপে, কপালের ঐ লাল টিপ, ঘরে জ্বালা আলোর প্রদীপ। পায়ে পর আলতার ছোঁয়া, বাকি আছে মেহেদি দেওয়া। এবার তবে পূর্ণ হলি, কোমরের ঐ বিছা পরি। এবার ময়না, নৃত্য কর, পাশে নিয়ে সখীর দল। রাঙিয়ে দে রে আবিরের ছোঁয়া, বয়ে যাবে নৃত্যের মেলা। ছড়া — নানুর বাড়ি চল মা, যাই নানুর বাড়ি, সাথে নেব পান-সুপারি। পয়সা-কড়ি আছে বল? নানুর জন্য কিনব শাল। সাথে নেব মিঠাই হাঁড়ি, নানু খুশি হবে বল? কি বলিস মা, পয়সা নেই? মাঠে গিয়ে কাজলা দেই? এখন বলবি— “খোকা চুপ!” মানব না কো আমি রূপ, যাবই আমি নানুর বাড়ি, কাজ হবে না তোর বাড়ি। চল মা, যাই নানুর বাড়ি, পরবি তুই নতুন শাড়ি। নানুর বাড়ি যাব বল? গিয়ে খাব পিঠা চল। নানুর বাড়ির আনন্দ— শেষ হবে না কখনও।