নির্বাচিত কবিতা সংকলন ১
**বাংলার লড়াই**
তানজির রহমান প্রত্যয়
পাক নেতাদের মনের আশা,
উর্দু হবে রাষ্ট্রভাষা।
তা হবে না, তা হবে না,
মুখ বুজে কেউ তা সবে না।
রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই,
নইলে মোদের চলবে লড়াই।
মুখের ভাষা কেড়ে নেবে,
অন্য ভাষার মুখোশ দেবে,
তা হবে না, তা হবে না,
মুখ বুজে কেউ তা সবে না।
বাংলার মানুষ লড়তে জানে,
দাবি আদায় করতে জানে।
ভাষার ডাকে ছুটলো সবাই,
বাঁধলো তখন ভীষণ লড়াই।
মা হারালো নয়ন মণি,
পিতা হারালো আশার খনি।
রফিক, শফিক, বরকত, সালাম—
বাংলা ভাষার এই প্রিয় নাম।
শিক্ষার্থী, একাদশ বিজ্ঞান, সরকারি এডওয়ার্ড কলেজ, পাবনা।
**আমার আকাশ**
মোঃ আব্দুল্লাহ
কিছু কথা তোমায় হয়তো
কখনো হয়নি বলা,
ছোট বেলা থেকে হাত
ধরে তুমি শিখিয়েছ পথ চলা।
অভাব বুঝতে দাও না
তুমি পূরণ কর সব বাসনা।
আমার অভাব পূরণই
যেন তোমার একটি মাত্র সাধনা।
কখনো বুঝতে দাও না
তুমি সংসার কেমনে চলে,
তোমায় ছাড়া মনে হয়
যেন আকাশ ভেঙে পড়ে।
দোয়া করি বাবা তোমায়
যেন বুঝতে না দিই কষ্ট।
গর্ব করে যেন বলতে
পারো তোমায় সন্তানই শ্রেষ্ঠ।
শিক্ষার্থী, একাদশ বিজ্ঞান, সরকারি এডওয়ার্ড কলেজ, পাবনা।
**রক্তাক্ত মহাবীর, ১৯৭১**
আবার জেগেছে দেখো রক্ত-জমাট তরুণ সৈন্য দল।
জেগে উঠেছে গ্রীষ্মের উত্তপ্ত সূর্যের ন্যায়।
সত্য যে এবার জেগে উঠেছে, থামাবে এবার কে?
মিথ্যা বুঝি দৌড়ে পালাল, সত্যের আগুনে পুড়ে।
সত্য সদা বুক পেতে দেয় মাতৃভূমির কল্যাণে,
মিথ্যা তো ভাই ছিটকে পড়ে সত্যের গর্জনে।
বুলেটের আঘাতে সত্য যেন অধিক দীপ্তিময়,
মিথ্যার কূটকৌশল ধ্বংস করে সত্যের হবে জয়।
যুগে যুগে মহাবীরের আগমনে পৃথিবী শুদ্ধ হয়,
হবেই হবে, এবার হবে দুষ্টের বিপর্যয়,
রক্তমাখা প্রশস্ত বুক পেতে দাঁড়িয়ে আছে কে রে?
সত্য যেন গর্জে বলে—
আমি বীর, শহীদের রক্তে রক্তাক্ত মহাবীর।
**হেমন্তের গান**
হেমন্ত যে এসেছে ধরায়,
শিউলি, গন্ধরাজের গন্ধ ছড়ায়।
চালতা ফল আর কামরাঙার টক,
সোনালি ধানের আধাপাকা মাঠ।
শীতের আগমনী ঠান্ডা বাতাস,
মাথার উপরে সুনীল আকাশ।
হালকা শীতের মিহি কুয়াশা,
হেমন্তের আগমনে শরৎ হারায় আশা।
দিনে কড়া রোদের ঝাঁঝ,
রাতে ঠান্ডার নরম কুয়াশা।
দিগন্ত জুড়ে চারদিকে মাঠ,
আমন ধানের সোনালি ক্ষেত।
নবান্ন যে এসেছে ধরায়,
নতুন ধানের গন্ধ ছড়ায়।
বর্ষার জল শুকিয়ে যায়,
ধান মাড়াইয়ে গরুর গাড়ি যায়।
গাছিরা হাঁড়ি ঝুলায়,
খেজুর গাছের উঁচু মাথায়।
ঢেঁকিতে ভানা নতুন চাল,
খেজুরের গুড়ের ভাপা পিঠা তাল।
হেমন্ত যে এসেছে ধরায়,
পিঠা-পায়েসের গন্ধ ছড়ায়।
**আমি**
রাফিদ ইমতিয়াজ
আমি হতে চাই,
একটি শিশুর উজ্জ্বল হাসি।
আমি হতে চাই, স্বাধীন চেতার রুদ্র কণ্ঠ,
আর সৈনিকের সুগঠিত হাতের পেশি।
আমি স্টেনগান, আমি এসএলআর,
আমি কার্তুজের পোড়া গন্ধ।
আমি মাটির সোঁদা গন্ধ।
আমি হতে চাই কৃষকের হাসি,
সোনালী পাকা ধান।
আমি স্কাড, আমি মিসাইল,
আমি ট্যাঙ্কের বিকট শব্দ।
আমি মাইন, আমি গ্রেনেড,
আছে যত সব শত্রুসেনা করবো ছিন্নভিন্ন।
আমি হতে চাই মুক্ত বাতাস, উজ্জ্বল রোদ,
সুস্থ পরিবেশ।
আমি হব এক সন্ত্রাসমুক্ত বৈষম্যহীন দেশ।
আমি শান্তির নীড়, সত্যের বীর,
মিথ্যা-প্রহসন মানি না।
আমি মাটির আমি কামানের গোলা,
আমি নিশ্চিত ঘুম, আর
পাখিদের কলকাকলির মেলা।
**পবিত্র শপথ**
খাদিজা সাদিয়া রাফি
বাতাসে যেন রক্ত
আহাজারির লাশের গন্ধ
দেখিতে লাগে তাহা ভারি মন্দ
তবুও থাকিবো মোরা একতাবদ্ধ।
করিবো মোরা গোলার আঘাত,
লাঠির আঘাত
দেখিয়া করিবো না ভয়,
মোরা জীবন দিয়ে করিতে—
চাই নিজের মাতৃভূমি জয়।
মোরা অজেয়,
মোরা অভয়,
মোরা মহাপ্রলয়,
মোরা হবো শৃঙ্খলমুক্ত।
মোরা দেশকে করিবো স্বৈরাচার মুক্ত,
মোরা করিবো অস্তিত্বের লড়াই।
ভেঙে চুরিয়া—
ছিন্নভিন্ন করিয়া দিবো,
দেশ থেকে স্বৈরাচারের বড়াই।
দেশপ্রেম ঈমানের অঙ্গ,
আর এতেই মোরা
সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব হিসেবে
সদা সর্বদা থাকিবো সংকল্পবদ্ধ।
দেশপ্রেমেই মোরা পরিতৃপ্ত,
লড়াই করিয়া করিয়া দিবো তাহাদের
অস্তিত্ব নিশ্চিহ্ন, আর ইনশাআল্লাহ হবে,
দেশের শত্রুদের পতন নিশ্চিত।
মোরা ঐক্য, মোরা সূর্য,
মোরা দেশের সে জন্য করিবো কুরবানি,
চলে যাক মোদের জীবন।
তবুও মোরা করিবো না অন্যায়ের কাছে মাথানত।
হয়ে যাক ফাঁসি,
তাহা হাসিমুখে
বরণ করে নিবো,
রাজি আছি।
মৃত্যুকে অমৃত মনে করিয়া,
হেমলকের বিষপান
খুশি মনে করিতে মোরা রাজি আছি,
তবুও স্বৈরাচারকে দিবো না স্বীকৃতি।
বাতাসে যেন রক্ত আর
হাজারো লাশের গন্ধ,
দেখিতে তাহা লাগে ভারি মন্দ
তবুও থাকিবো মোরা একতাবদ্ধ।
মোরা গোলার আঘাত, লাঠির আঘাত,
দেখিয়া করিবো না ভয়
জীবন দিয়ে করিবো নিজের,
মাতৃভূমি জয়।
শিক্ষার্থী, একাদশ বিজ্ঞান, সরকারি এডওয়ার্ড কলেজ, পাবনা।
**তারুণ্যের জয়গান**
ফারিহা ইসলাম ঐশী
আঁধারের পর্দায় ঢেকে গেছে শহর
হঠাৎ কোথা থেকে এলো যেন ঝড়ের খবর।
চোখ মেলে তাকাতেই বোঝা যায়
মশাল হাতে তরুণেরা ছুটে যায়।
সত্যের পথে তারুণ্যের এই ছুটে চলা,
অশান্ত সাগরে দৃপ্ত তরীর পাল তোলা,
ভয় নেই, নজরুল, এসে গেছে আজ কাণ্ডারী
তারাই মহাত্রাস, মহামারী ঐ স্বৈরাচারী।
অন্যায়ের টুটি ধরবে চেপে আজ তারুণ্যের হাত,
তাদের পদধ্বনিতে পালাবে যত ভীরু চোর-ডাকাত।
দেশমাতৃকার টানে আজ এসেছে তারই ছেলেমেয়ে,
চাপা স্ফুলিঙ্গ জ্বলে উঠে, যারা ছিল এতকাল ঘুমিয়ে।
ও দেখ, ও ছুটছে তারা আঁধারের বুক চিরে,
যাবেই তারা পৌঁছে একদিন বিজয় সাগরের তীরে।
বিজয় কেতন উড়াবে তারাই বাংলার এই বুকে,
ওহে তারুণ্য, সদা সজীবতা যেন থাকে তোমাদের মুখে।
একাদশ বিজ্ঞান, সরকারি এডওয়ার্ড কলেজ, পাবনা।
**বর্ষাকাল**
মেহেদী হাসান সিদ্দিকী সিয়াম
বর্ষা বর্ষা বর্ষা
ওহে অতুল্য ঋতু বর্ষা
আষাঢ়ে আসো, শ্রাবণেও থাকো
রূপ যে দেখাও সে কত!
ও নীল আকাশে সাদা মেঘ ভাসে
রিমঝিম বৃষ্টি পড়ে,
বৃষ্টির জলে জলাশয় ভরে
শোনা যায় ব্যাঙের গান।
বর্ষার জলে, ঠই ঠই করে
কিশোরেরা বানায় ভেলা,
সাঁতার কেটে, জলে ঝাঁপিয়ে
কেউ কেউ করে খেলা।
সেই জলে শাপলা ফুটে
কিশোরীরা বানায় মালা,
সখীর সঙ্গে গল্পে গল্পে
কেটে যায় সেই বেলা।
মাঝি ভাই বায় তরি
লাল-সবুজ দাঁড় টানি,
কতই না অপরূপ তুমি
ওহে প্রিয় ঋতু বর্ষা।
শিক্ষার্থী, অনার্স প্রথম বর্ষ, অর্থনীতি বিভাগ, সরকারি এডওয়ার্ড কলেজ, পাবনা।
**বিদ্যা জ্ঞানের সারণি**
আতিফা খাতুন নাহার
স সকল অজ্ঞতায় আলোয় দীপ্তিমান সে দ্বার,
র রবে করুণায় তাহারই কত নব প্রাণ, হয়েছে অগ্রসর।
ক কাজেই দিয়ে নয়, বিদ্যা দিয়ে লিখেছে সুপ্রভ ভবিষ্যৎ,
র রসিকতা নয়, মঙ্গল জ্ঞানই সদা অম্লান, শক্তিতেই বলিয়ান।
এ এ ভুবনের পথে আঁকা বৃক্ষ শোভিত সবুজের ছাপবিন্দু,
ও অমলিন ভুবনের নকশায় যেন ভেসে ওঠে তার মহাকাল কৃপাসিন্ধু।
ই ইচ্ছা নয় তরুণ প্রাণেরা সৃজনশীল উল্লাসে ওঠে মেতে,
যা যা শব্দ করে নয় নিঃশব্দে নব সুখের সন্ধান কিংবা গভীর সংকেতে।
ক কত সুখ কত কাতরতা তোমার স্মৃতির রোমন্থনে,
ল লেখ্য ভাষায় সেইসব আবেগ মেলে ভার।
র রঞ্জনাভরা লিখিত-অলিখিত সব ভালোবাসা তোমার।
প পারবো না জ্ঞানের তৃষ্ণা মিটাতে আমি ভ্রান্তির ছলে,
ব বহুল স্থূল এ ভুবনে, বিদ্যা মেঘের ছায়া সরিয়ে জ্ঞানের আলো পারে জ্বালাতে।
ন নানা উপায়ে বিদ্যা মানুষকে জ্ঞানী করে গড়ে তোলে।
শিক্ষার্থী, দ্বাদশ মানবিক, সরকারি এডওয়ার্ড কলেজ, পাবনা।
**আরাধনা**
বায়েজিদ বোস্তামী
আমাকে তোমার না ভাবো— আমায় তুমি চন্দ্র, নক্ষত্র ভাবতে পারো।
আঁধার রাতে পথ দেখাবো, ভয় পেলে তোমার সঙ্গী হবো।
নাই-বা ভাবো আমায় কোনো প্রেমময় বর্ষা,
আমায় তুমি ভাবতে পারো তোমার মাথার উপর অহেতুক এক ছাতা।
আমায় তুমি হেলায় রেখো,
যেমন রাখো তোমার পাশে সবটা পড়া পুরানো বইয়ের মতো।
আমায় না হয় ধুলো হয়ে বাঁধতে দিও তাদের সাথে খানিক জমাট।
আমায় তুমি কিছু একটা ভেবো,
কোথাও না কোথাও একটু খানিক আড়াল করে রেখো।
ছেলেবেলার বুক-পকেটে যেমন রাখতে আধুলি,
কৈশোরে কেনা সাইকেলে তুমি যেমন বাজাতে ধ্বনি,
চাইলেই আমায় ডাকতে পারো তেমন করে তুমি।
মোদের মাথায় প্রথম যেদিন নিকোটিনের ধোঁয়া উড়ালে তুমি,
তাদের সাথে আমায় না হয় গোপন করে রেখো একটু খানিক।
তবুও তুমি আমার কথা অল্প হলেও ভেবো,
খানিক না হয় আড়াল করে একটু-খানি রেখো।
আমায় তুমি এমন করে ভুলেই যেও না,
আমি তোমার কেউ না হলেও তুমি আমার অতটা পর ছিলে না।
**বিরহের প্রতিচ্ছবি**
মোঃ সোহান হোসেন
আমার আর বাঁচিবার ইচ্ছা নাই
জরাজীর্ণ এই পৃথিবীতে,
যদি সুখের দেখা না পাই
মাথার উপর নাই থাকে ছাদ।
এ কি নিদারুণ কষ্ট,
পথ খুঁজে পাই না আর।
আমার এ অর্জন, শুধুই কি আমার?
তাহলে তোমার যে প্রেরণা, শুধুই কি ম্লান?
তোমার কাছেই তো আমার, হাতে ধরা সব,
তোমার প্রেরণাতেই আমি সব পেয়েছি আজ।
কোনো কিছুই থেমে নেই, চলছে নিরবধি,
সবকিছুই আছে, শুধু নেই তুমি।
তোমাকে দেখি না, কতদিন হলো,
খুঁজতে খুঁজতে ক্লান্ত হয়ে, অবশেষে নিরবধি।
তুমি যে বলতে, কিছুই পারি না আমি,
এখন তো সব, একাই একাই করি।
তোমার অনুপস্থিতি আজ
হৃদয়ে যেন শূন্য সাজ,
জানি তুমি আসবে না, কোনোদিন আর।
তবু তোমার অপেক্ষায় কাটছে সময়,
যেতে হবে জানি, সবারই একদিন,
তবুও তুমি কেন এতটা তাড়াতাড়ি?
যেখানে থেকো ভালো থেকো, অবশেষে বলি,
তোমাকে দেখার অপেক্ষায়, প্রহর গুনি।
সেদিন বলবো আমি, এই পৃথিবীর
জরাজীর্ণ কাহিনী।
শিক্ষার্থী, অনার্স দ্বিতীয় বর্ষ, ইংরেজি বিভাগ, সরকারি এডওয়ার্ড কলেজ, পাবনা।
**মা আমার মাটি**
মোঃ রাজিবুল হক
মা আমার মাটি— স্নেহের বন্ধনহীন ঢেউ,
তাঁর কোলে শুয়ে শুনেছি গল্প, স্বপ্ন বুনেছি ঢেউ-ঢেউ।
তারই বুকে খেলেছি খেলা, কেটেছে শৈশবকাল,
মাটির গন্ধে মিশে আছে মায়ের মমতার জাল।
মা আমার মাটি— নরম তার বুক,
তারই দুধে গড়ে উঠেছে জীবনের সব সুখ।
রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে নিজে,
সন্তানদের রাখেন তিনি আড়াল করে।
ক্ষুধার্ত মুখে দেন শেষ কণাটুকু ভাত,
নিজে থাকেন উপবাসে, করেন না কোনো আভাস।
মায়ের চোখে ঝরে যে অশ্রু বিন্দু,
সেই জলেই জন্মায় ফসল— জীবন-মরণের বন্ধু।
মা আমার মাটি— ত্যাগের অপর নাম,
যে মাটিতে বুনি আশা, ফোটে ভালোবাসার দাম।
এই মাটিতেই শুয়ে আছে কত শত বীর,
যাদের রক্তে রাঙা হয়েছে প্রান্তর আর নীর।
মা আমার মাটি— একেই তো বলি,
তার ভালোবাসায় পাই জীবনের রং তুলি।
যে মাটি দেয় দান, যে মা দেয় প্রাণ,
দু’জনেই আমার আশ্রয়, আমার জ্ঞানের স্থান।
মা আমার মাটি, কোমল আর ধৈর্যভরা,
তাঁর কোলে পাই শান্তি, আশ্রয় সোনাঝরা।
ঝড়ে যখন দুলে যায় জীবনের গাছ,
মায়ের ছায়ায় থেমে যায় সব কাঁপন, সব আঘাত।
মা আমার মাটি, মা আমার প্রাণ,
তাঁর কোলে গাই আমি শান্তির গান।
জীবন ফুরোলেও এই হৃদয় বলে— মা,
তুই আছিস মাটির ঘরে,
আর আছিস “মা” তুই আমারই অন্তরে।
শিক্ষার্থী, অনার্স চতুর্থ বর্ষ, ব্যবস্থাপনা বিভাগ, সরকারি এডওয়ার্ড কলেজ, পাবনা।