**যে চিঠি দেবো বলে অপেক্ষায়** আতিক শাহরিয়ার প্রিয়তমা, আজ শরতের এ রাতে যখন পূর্ব-দক্ষিণ দিক থেকে হাওয়া দিচ্ছে, চারপাশে ঝিঁ ঝিঁ পোকার ডাক, বাতাসে শরতের সুবাস; তখন কেবল ডায়েরি চিঠি জমাবো কিংবা অন্তরে তোমাকে আঁকড়ে রাখার জন্য নয়, তোমাকে লিখছি যেন গোটা পৃথিবী জানে, শরতের দুপুরে নিরালায় বসে থাকা কোনো এক নিঃসঙ্গ মানুষের মতো একজন এক প্রেমিক তার ভবিষ্যৎ অর্ধাঙ্গিনীর জন্য অপেক্ষায়। দুই যুগ পেরিয়ে এসেছি জন্মের পর। মানুষরূপী জীব হয়ে জন্ম নিয়ে ‘মানুষ’ হয়ে মরবো বলে অনন্তের পথে যাত্রা করছি প্রতিদিন। যখন থেকে বুঝতে শিখেছি, দেখলাম নারী একজন পুরুষের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। সচেতন পাঠক মাত্রই আমার সাথে একমত হতে পারেন, নারীকে প্রথম পেলাম মায়ের রূপে, যিনি এ পৃথিবীতে আমার আগমনের পথ হলেন। মায়ের পরেই পেলাম বোন, তারপর যখন কৈশোর-যৌবন পার করলাম, অন্তরে যখন প্রেমের জোয়ার এলো, নর-নারীর প্রেম, তখন বুঝতে পারলাম নারীর আরেক রূপ হলো প্রেমিকা। সত্যিই কি তাই? এ বয়সের জন্য নারী প্রেমিকা হিসেবেই ধরা দেয় বটে। হয়তো স্রষ্টার পরিকল্পনা ভিন্ন, তাই যখন প্রেম একটা মরীচিকার মতো চোখের সামনে রঙিন পর্দা দিয়ে রাখে, তখন তোমায় পেলাম না আমি। স্রষ্টা হয়তো চেয়েছেন মন ও মনে আরও পরিণত হই। প্রেম কেবল কামনার মোহ আর অপরিণত বয়সের মধ্যে আটকে না থেকে জাগুক বোধ। কর্তব্যের ছায়ায়, ভালোবাসার উষ্ণতায় প্রেম থেকে পবিত্রতার সন্ধানে আবদ্ধ হই। তাই তিনি দ্বিতীয় যুগের সমাপ্তি ঘটিয়ে নিয়ে এলেন তৃতীয় যুগের সূচনা। প্রিয়তমা, তুমি কে, কোথায় আছো, কেমন আছো, জানা নেই আমার। তা কেবল জানেন স্রষ্টা। তোমাকে ভালো রাখার দায় তার উপর ছেড়ে রেখেছি। হঠাৎ যখন বিষণ্ণতায় ভুগি, মনে হয় তুমি হয়তো ভালো নেই। ইবাদতে তখন তোমার ভালোটা চাই। তোমাকে তখন দেওয়ার মতো নিজেকে ছাড়া আর প্রার্থনাটুকুই আছে কেবল। বসন্ত আসে, বসন্ত যায়। কোকিল ডাকে, বাগানে গোলাপ ফোটে, তোমাকে দেবো বলে হাত বাড়ালেই দেখি সামনে শূন্যতা কেবল। আমি ব্যতীত সেখানে কেউ নেই, কিছু নেই। বিবেকবান ও প্রজ্ঞাসম্পন্ন মানুষ স্বীকার করবেন, বিবাহ একটি পবিত্র পারিবারিক বন্ধন। দুজনের মিলনের সাথে সাথে দুটি পরিবারের পারিবারিক আচার ও সংস্কৃতির মেলবন্ধন ঘটে এ মাধ্যমে। তাই বিবাহে পরিবারের গুরুজনদের দোয়া-আশীর্বাদ অত্যন্ত জরুরি। প্রিয়তমা, আধুনিক যে প্রেম, তাতে দেখা যায় দুজনের আবেগের এতটাই প্রাচুর্য থাকে যে, সেখানে বাস্তবতার কোনো অবকাশ পাওয়া যায় না। ফলে বেশিরভাগ সময় দেখা যায় ভুল সিদ্ধান্তে কয়েকটি জীবন কান্নার স্রোতে ভেসে যায়। তাই আমি বলবো, বড়রাও যে ভুল করে না তা নয়, তারাও ভুল করে। মানবজীবনে অর্থ-সম্পদের দরকার আছে। তবে এখন আমাদের যুগে এসে মানুষের চরিত্রের থেকেও বেশি দামি হয়ে উঠেছে সম্পদ। যার যত অর্থ আছে, সে সম্মানিত হলেও গ্রহণযোগ্য। যার চরিত্র সুন্দর, অর্থ-সম্পদ না থাকলে সেই চরিত্রের খোঁজ কেউ রাখে না। তাকে অবহেলা না করলেও অবমূল্যায়ন করে। প্রিয়তমা, জীবনসাথী অর্থ কেবল স্বামী বা কর্তা হয়ে ওঠা নয়। স্বৈরাচারী শাসক কিংবা একচেটিয়া ব্যবসায়ীর মতো হওয়া নয়। জীবনসঙ্গী অর্থ একজন বন্ধু—বন্ধুত্বের এক বন্ধন, ভরসা ও ভালোবাসার আশ্রয় হয়ে ওঠা। জানি না নিজেকে সেভাবে গড়ে তুলতে পারছি কিনা। তবে নিজেকে যেন তোমার বন্ধু হিসেবে রাখতে পারি, তোমার সামনে সেই প্রচেষ্টা থাকবে আমার। হে আমার চিরবন্ধু, আমার সম্পূর্ণতা, তুমি কোথায় আছো, কবে আমাদের সাক্ষাৎ হবে জানা নেই, হয়তো আমরা আমাদের আশেপাশেই আছি। কেবল আমরা জানি না যে আমরা একে অপরের। সেই মাহেন্দ্রক্ষণ হয়তো এখনো আসেনি, অথবা অতি শীঘ্রই আসবে। হে প্রিয় বন্ধু, আমরা দুই যুগের এ জীবনে নানান ঘটনা অবলোকন করেছি। আমরা দুঃসময় দেখেছি, আন্দোলন দেখেছি, কলহ-সংঘর্ষ দেখেছি, স্বৈরাচারের পতন দেখেছি। তবুও প্রিয়তমা, এখনো একসাথে অনেক কিছু দেখার বাকি। পাশাপাশি হেঁটে আমাদের প্রিয় শহর দেখা বাকি। প্রিয় ক্যাম্পাসের কৃষ্ণচূড়ার গলিপথে হাঁটা বাকি। একসাথে বইমেলা ঘোরা বাকি, প্রিয় লেখকের লেখা নিয়ে আলোচনা করা বাকি। সন্ধ্যার নীরবতায় চা-কফির আড্ডা বাকি। আমাদের এখনো নীড় গড়া বাকি। দুজন মিলে মিশে একটি পরিবার গড়ার কারিগর হওয়া বাকি। নিজেকে যোগ্যতা সহকারে গড়ে তোলার এ যাত্রাপথে তোমাহীন আমি শূন্যতা নামক পাথরের ভারে আজ বড় ক্লান্ত। মাঝে মাঝে মনে হয় আমাদের হয়তো কখনো দেখা হবে না। আমাদের হয়তো কখনো গৃহ হবে না। হয়তো আমাদের কখনো আমাদের হওয়া হবে না। অন্তরে জমিয়ে রাখা ভালোবাসার অর্ঘ্য তোমাকে অর্পণ করা হবে না। প্রিয়তমা, চিরবন্ধু আমার, তুমি ভালো থেকো। শীঘ্রই আমাদের দেখা হোক, সেই আকাঙ্ক্ষায় অপেক্ষারত। তোমার প্রিয়তম শাহরিয়ার লেখক: শিক্ষার্থী, স্নাতকোত্তর (শেষ পর্ব), বাংলা বিভাগ, সরকারি এডওয়ার্ড কলেজ, পাবনা