Splash
বাংলাদেশের পাবনা জেলার ঈশ্বরদী উপজেলার রূপপুর নামক স্থানে নির্মিত হচ্ছে দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র। সাধারণ মানুষের প্রশ্ন—এই বিদ্যুৎ উৎপন্ন হয় কীভাবে? কেনইবা আমাদের দেশ এই বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণে প্রাথমিকভাবে ১ লক্ষ ১৩ হাজার কোটি টাকারও বেশি খরচ করছে? আমাদের দেশে বর্তমানে বেশির ভাগ বিদ্যুৎ উৎপাদন হয় ডিজেল, গ্যাস ও কয়লার মাধ্যমে; কিছু বিদ্যুৎ উৎপাদন হয় কাপ্তাইয়ে Hydroelectric Power Plant মাধ্যমে। এখন দেশে মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা প্রায় ২৫,২৩৫ মেগাওয়াট। দিন দিন বিদ্যুতের চাহিদা যে হারে বাড়ছে, তাতে প্রচলিত পদ্ধতিতে উৎপাদন বাড়াতে গেলে পরিবেশেরও ক্ষতি হবে। পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনকে পরিবেশবান্ধব হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বর্তমানে বিশ্বে একদিকে পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে সরে আসার প্রবণতা যেমন আছে, আবার জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি কমাতে পারমাণবিক বিদ্যুৎকে তেল ও কয়লার মতো জীবাশ্ম জ্বালানির বিকল্প হিসেবেও দেখা হচ্ছে অনেক দেশে। রূপপুরে বসানো হচ্ছে আধুনিক প্রযুক্তির VVR-1200 মডেলের রিঅ্যাক্টর। এই রিঅ্যাক্টরে পারমাণবিক জ্বালানি পুড়িয়ে মূল শক্তি উৎপাদন হবে এবং প্রথম রিঅ্যাক্টর থেকে ১২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হবে। এখানে দুটি ইউনিট থাকবে, মোট উৎপাদন ক্ষমতা হবে ২৪০০ মেগাওয়াট। রাশিয়ান কোম্পানি Rosatom এই প্রকল্পটি নির্মাণ করছে এবং জ্বালানি সরবরাহ করছে। তাদের মতে, ইউনিটগুলির একটি প্রাথমিক জীবনকাল ৬০ বছর রয়েছে, যা আরও ২০ বছর বাড়ানো সম্ভব। রোসাটমের নোভোসিবিরস্ক কেমিক্যাল কনসেনট্রেট প্ল্যান্টে এই রিঅ্যাক্টরের জ্বালানি (ইউরেনিয়াম রড) তৈরি করা হয় এবং বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের তত্ত্বাবধানে বিমান ও সড়কপথে তা পরিবহন করে প্রথম ইউনিটে স্থাপন করা হয়।
খনি থেকে ইউরেনিয়াম আকারিক আকারে উত্তোলনের পর চূর্ণ করে এগুলোকে আগুনে পোড়ানো হয়, যার ফলে এর সঙ্গে থাকা কার্বন অপসারিত হয়। এরপর এর সাথে সালফিউরিক অ্যাসিড যুক্ত করা হয়। ফলে ইউরেনিয়াম অক্সাইড তরল হিসেবে পাওয়া যায়। এরপর এই তরলের সাথে অ্যামোনিয়া যুক্ত করা হয়, ফলে উৎপন্ন হয় ইউরেনিয়াম ইয়েলো কেক। পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে ব্যবহারের জন্য এই ইয়েলো কেক ইউরেনিয়াম আরও বিশুদ্ধ করার প্রয়োজন হয়। ইয়েলো কেক ইউরেনিয়ামে U-238 এর পরিমাণ প্রায় 99.3% এবং U-235 এর পরিমাণ মাত্র 0.7%। পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রে জ্বালানি হিসেবে মূলত U-235 ব্যবহৃত হয়। তাই U-238 থেকে U-235 আলাদা করার প্রয়োজন হয়। ইউরেনিয়ামের ইয়েলো কেকের সাথে ফ্লোরিন যুক্ত করা হয়, ফলে ইউরেনিয়াম হেক্সাফ্লোরাইড গ্যাস উৎপন্ন হয়। ইউরেনিয়াম হেক্সাফ্লোরাইড উচ্চ গতিসম্পন্ন সেন্ট্রিফিউজের মাধ্যমে U-238 থেকে U-235 আলাদা করা হয়। যখন এই মিশ্রণে U-235 থাকে প্রায় 80% এবং U-238 থাকে প্রায় 20%, তখন এটি পারমাণবিক চুল্লিতে ব্যবহারের উপযোগী হয়। এই অবস্থায় ইউরেনিয়াম হেক্সাফ্লোরাইড গ্যাস কঠিন অবস্থায় আনার জন্য এর সাথে ক্যালসিয়াম যুক্ত করা হয়। এই ক্যালসিয়াম ইউরেনিয়াম হেক্সাফ্লোরাইডের সাথে যুক্ত হয়ে লবণে পরিণত হয়, ফলে অবশিষ্ট থাকে ইউরেনিয়াম অক্সাইড। ১৪০০ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রায় এই ইউরেনিয়াম অক্সাইড ছোট ছোট প্যালেটে রূপান্তর করা হয়। এই প্যালেটগুলো স্টিলের পাইপে ভরা হয়, যাকে বলা হয় ইউরেনিয়াম রড বা ফুয়েল রড।
এ রকম বেশ কয়েকটি রড দিয়ে তৈরি করা হয় ইউরেনিয়াম বান্ডেল। এই ইউরেনিয়াম বান্ডেলগুলো পারমাণবিক চুল্লিতে ব্যবহার করা হয়। এগুলো পারমাণবিক চুল্লিতে ৫ বছর পর্যন্ত ব্যবহার করা যায়। এরপর এগুলোর তাপ উৎপাদন ক্ষমতা হ্রাস পায়, যা বাণিজ্যিকভাবে গ্রহণযোগ্য হয় না। যদিও ইউরেনিয়াম রডগুলো আগের মতোই দেখতে হয় এবং কোনো পরিবর্তন বোঝা যায় না। ইউরেনিয়াম বান্ডেলের ব্যবহার শেষে পারমাণবিক কেন্দ্র থেকে বের করার পর এমন স্থানে রাখা হয়, যেখানে সর্বক্ষণ ঠান্ডা রাখা হয়। এই ব্যবস্থা পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ভিতরেই করা হয়। একে বলা হয় কুলিং বেস। এখানে প্রায় দশ বছর রাখার পর ইউরেনিয়াম বান্ডেলগুলো অন্যত্র স্থানান্তর করা হয়। স্থানান্তর করার পূর্বে এগুলোকে কংক্রিটের ঢালাই দ্বারা আবৃত করা হয়, তখন এই ইউরেনিয়াম বান্ডেলগুলোকে বলা হয় পারমাণবিক বর্জ্য। এগুলো থেকে α, β, γ তেজস্ক্রিয় রশ্মি নির্গত হয়, যা প্রাণী ও পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর। এগুলো হাজার কোটি বছর ধরে তেজস্ক্রিয় রশ্মি নির্গত করতে থাকে। এজন্য এই পারমাণবিক বর্জ্যকে পৃথিবীর কিছু নির্দিষ্ট জায়গায় নিরাপদভাবে রাখা হয়, যাতে প্রাণী ও পরিবেশের ক্ষতি না হয়।
পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রকে চারটি অংশে বিভক্ত করা যায়— 1. নিউক্লিয়ার রিঅ্যাক্টর 2. স্টিম জেনারেটর 3. ইলেকট্রিক জেনারেটর 4. কুলিং টাওয়ার নিউক্লিয়ার রিঅ্যাক্টরের ভিতরে ইউরেনিয়াম বান্ডেল স্থাপন করা হয় এবং এই বান্ডেলের ফাঁকে ফাঁকে কন্ট্রোল রড বসানো থাকে। এই কন্ট্রোল রড তৈরি করা হয় বোরন, ক্যাডমিয়াম অথবা ইন্ডিয়াম দিয়ে। কন্ট্রোল রডের কাজ হলো নিউক্লিয়ার রিঅ্যাক্টরের ভিতরে নিউক্লিয়ার বিক্রিয়া শুরু হলে সেটিকে নিয়ন্ত্রণ করা। নিউট্রন শোষণের মাধ্যমে এটি কাজ করে। তাই কন্ট্রোল রড এমনভাবে বসানো হয় যেন প্রয়োজন অনুযায়ী রিঅ্যাক্টরের ভেতরে প্রবেশ বা বের করা যায়। ইউরেনিয়াম বান্ডেল ও কন্ট্রোল রড নিউক্লিয়ার রিঅ্যাক্টরে স্থাপন করার পর সম্পূর্ণ রিঅ্যাক্টর পানি দিয়ে পূর্ণ করা হয়। রিঅ্যাক্টরে নিউক্লিয়ার ফিশন বিক্রিয়া শুরু হলে ইউরেনিয়াম রড উত্তপ্ত হতে শুরু করে, ফলে রিঅ্যাক্টরের পানি গরম হয়। এই পানির তাপমাত্রা প্রায় 570°F (প্রায় 300°C) এর মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হয়। কিন্তু ইউরেনিয়াম রড অবিরত উত্তপ্ত থাকায় অতিরিক্ত তাপ হিট এক্সচেঞ্জারের মাধ্যমে স্টিম জেনারেটরে স্থানান্তর করা হয়। এই তাপ স্টিম জেনারেটরের ভেতরের পানিকে বাষ্পে পরিণত করে। উৎপন্ন বাষ্প স্টিম জেনারেটরের ভিতরে চাপ বৃদ্ধি করে। এই বাষ্প যথেষ্ট চাপে পৌঁছালে তা টারবাইনে প্রবেশ করানো হয়, ফলে টারবাইন ঘুরতে শুরু করে। টারবাইনের সাথে যুক্ত থাকে ইলেকট্রিক জেনারেটর বা ডায়নামো। এর ঘূর্ণনের ফলে বিদ্যুৎ উৎপন্ন হয়। উচ্চ চাপের বাষ্প টারবাইনকে ঘুরিয়ে প্রবেশ করে কনডেনসারে এবং কনডেনসার থেকে প্রায় 200 মিটার উঁচু কুলিং টাওয়ারে যায়। কুলিং টাওয়ার উচ্চ তাপমাত্রার এই বাষ্পকে ঠান্ডা করে পানিতে পরিণত করে এবং কিছু বাষ্প টাওয়ারের ওপর দিয়ে বায়ুর সাথে মিশে যায়। এই পানি নদী থেকে আহরিত আরও পানির সাথে যুক্ত করে কনডেনসারের ভিতর দিয়ে পুনরায় স্টিম জেনারেটরে পাঠানো হয়। এই পানি আবার বাষ্প হয়ে টারবাইনে প্রবেশ করে। এই প্রক্রিয়া চক্রাকারে চলতে থাকে এবং ইলেকট্রিক জেনারেটর বিদ্যুৎ উৎপাদন করে। ইউরেনিয়ামের ছোট একটি পেলেটে ১৭০০০ ঘনফুট গ্যাস, অথবা ৮৫০ কেজি কয়লার সমপরিমাণ শক্তি থাকে। পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে ১ গ্রাম ইউরেনিয়াম থেকে যে পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপন্ন হয়, ততটুকু বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে ২২৭০ লিটার জ্বালানি তেল প্রয়োজন হয়। ইউরেনিয়াম প্রকৃতিতে দুষ্প্রাপ্য নয়। সমস্যা হচ্ছে খনি থেকে ইউরেনিয়াম আকরিক আহরণের পর একে ব্যবহার উপযোগী করে তোলা। তাহলে বোঝাই যাচ্ছে, পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের স্থাপন খরচ বেশি হলেও ৮০ বছর মেয়াদের জন্য প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের উৎপাদন খরচ কম হবে। রূপপুর পারমাণবিক চুল্লির পাঁচ স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এই পাঁচ স্তরের নিরাপত্তা বৈশিষ্ট্যের কারণে মানবসৃষ্ট ঘটনা/দুর্ঘটনা বা প্রাকৃতিক বিপর্যয় যেমন—শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড়, ভূমিকম্প, বন্যা ইত্যাদির প্রভাব মোকাবেলায় সক্ষম থাকবে এই পারমাণবিক চুল্লি। এই পাঁচ স্তরের নিরাপত্তা বৈশিষ্ট্য ছাড়াও এই প্ল্যান্টের ডিজাইন এমনভাবে করা হয়েছে, যাতে ৮ মাত্রার ভূমিকম্পেও প্ল্যান্ট নিরাপদ থাকবে। এছাড়া ৫.৭ টন পর্যন্ত ওজনের বিমানের আঘাতেও এটি অক্ষত থাকবে।
### তথ্যসূত্র: 1. Dhaka Tribune (10/09/2021) 2. Nuclear Power – Wikipedia 3. U.S. Energy Information Administration 4. [www.rooppurnpp.gov.bd](http://www.rooppurnpp.gov.bd) 5. বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (05/10/2023)
লেখক : অধ্যক্ষ, সরকারি এডওয়ার্ড কলেজ, পাবনা